শিক্ষার সংকট, অনলাইনের ফাঁদ ও পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, গত দেড় যুগে আমরা বারবার নানা পরীক্ষামূলক পদ্ধতি গ্রহণ করেছি, কিন্তু তার অধিকাংশই শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং এসব পরিবর্তন, নীতির অস্থিরতা এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতা মিলিয়ে শিক্ষার মানকে ধীরে ধীরে নিম্নমুখী করেছে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল—এই মৌলিক সত্যটি আমরা যতটা উপলব্ধি করা উচিত ছিল, ততটা করতে পারিনি বলেই আজ এই সংকট এত প্রকট হয়ে উঠেছে।

প্রথমেই বলতে হয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতার অভাব আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এক সময় সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হলো, পরে সেটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো চালু করা হলো আবার বাতিল করা হলো। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে জিপিএ-৫ সহজলভ্য হয়ে পড়ল, ফলে ফলাফল কাগজে ভালো দেখালেও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ল। এসব নীতিগত পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা একটি স্থিতিশীল পথনির্দেশনা পায়নি। অভিভাবকরা বিভ্রান্ত হয়েছেন, শিক্ষকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন, আর শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে পরিশ্রমের পরিবর্তে শর্টকাটের দিকে ঝুঁকেছে।

এই প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯ মহামারি একটি বড় ধাক্কা হয়ে আসে। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠাভ্যাস ভেঙে যায়। অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে পাঠদান চালু করা হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি ছিল সীমিত কার্যকর। শহরের কিছু শিক্ষার্থী হয়তো অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পেরেছে, কিন্তু গ্রামীণ অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থী ইন্টারনেট সুবিধা, ডিভাইস বা উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে গেছে। ফলে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, শৃঙ্খলা এবং গভীরভাবে শেখার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

অনলাইন শিক্ষার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর অগভীরতা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগ, আলোচনাভিত্তিক শিক্ষা, সহপাঠীদের সঙ্গে পারস্পরিক শেখা—এসবের কোনো বিকল্প অনলাইন মাধ্যমে পুরোপুরি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসগুলো আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকেছে, শিক্ষার্থীরা কেবল উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয়নি। পরীক্ষার ক্ষেত্রেও নমনীয়তা ও ছাড় দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ কমিয়ে দিয়েছে।

কোভিড-পরবর্তী সময়ে যখন ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে শুরু করল, তখন প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার মান পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাসের ঘাটতি, মনোযোগের অভাব এবং দ্রুত ফল পাওয়ার মানসিকতা আরও দৃঢ় হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ের দেশব্যাপী অস্থিরতা। এই সময় অনেক ক্ষেত্রে ‘গণহারে পাস’ বা নমনীয় মূল্যায়নের যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা শিক্ষার মানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে এই ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে যে, ডিগ্রি অর্জনই মূল লক্ষ্য, জ্ঞান অর্জন নয়। এই মানসিকতা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ ভবিষ্যতে এই শিক্ষার্থীরাই প্রশাসন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং সমাজের নেতৃত্ব দেবে। যদি তাদের ভিত্তি দুর্বল হয়, তবে তার প্রভাব পড়বে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে।

এই অবস্থার মধ্যে নতুন করে যদি জ্বালানি সংকটের কারণে আবার অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হয়, তবে তা হবে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলা। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, অনলাইন শিক্ষা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। এটি একটি সহায়ক মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু মূলধারার বিকল্প হিসেবে কার্যকর নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্য বিদ্যমান, সেখানে অনলাইন শিক্ষার ওপর নির্ভরশীলতা শিক্ষার মানকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দেবে।

বর্তমানে জ্বালানি সংকট একটি বাস্তব সমস্যা, এবং এটি মোকাবিলা করতে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু সেই ত্যাগ যেন শিক্ষার গুণগত মানকে ধ্বংস না করে, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনলাইন শিক্ষার পরিবর্তে একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন করা। বর্তমানে সকাল দশটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত যে সময়সূচি প্রচলিত রয়েছে, তা পরিবর্তন করে সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত করা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় হবে, একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থেকে পাঠ গ্রহণের সুযোগ পাবে।

এই পরিবর্তন সহজ হবে না। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রশাসন—সকলের জন্যই এটি একটি চ্যালেঞ্জ হবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এই কষ্টটুকু মেনে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। আমরা যদি আজ সামান্য কষ্ট এড়িয়ে যাই, তবে আগামীতে এর মূল্য আরও বড় হয়ে ফিরে আসবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের বুঝতে হবে যে, শিক্ষা কেবল একটি নিয়মিত কার্যক্রম নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক সংকট, অর্থনৈতিক চাপ বা জ্বালানি ঘাটতি—এসব সাময়িক সমস্যা। কিন্তু শিক্ষার মান একবার নিচে নেমে গেলে তা পুনরুদ্ধার করতে বহু বছর, কখনো কখনো কয়েক প্রজন্ম সময় লেগে যায়।

বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই যে অনগ্রসরতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে শেখার আগ্রহ কমে গেছে, সেটি ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমের সংস্কার, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, লাইব্রেরি সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবন—এসব ক্ষেত্রেও কাজ করতে হবে। কিন্তু যদি এর মধ্যেই আমরা আবার একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাই, যেমন অনলাইন শিক্ষার ওপর নির্ভরতা, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করতে হলে আমাদের বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। উন্নত দেশের মডেল অন্ধভাবে অনুসরণ করে লাভ নেই। আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বারবার পরিবর্তনের ফলে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।

শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরকে কেবল পাঠদানকারী হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান নির্মাতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য তাদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক—সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আজ আমরা একটি সংকটময় সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে দুটি পথ—একটি সহজ, যেখানে আমরা সাময়িক সমস্যার সমাধান হিসেবে অনলাইন শিক্ষার মতো সহজ বিকল্প বেছে নেব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি বহুগুণ বেশি হবে। অন্যটি কঠিন, যেখানে আমরা কিছু ত্যাগ স্বীকার করে সরাসরি শিক্ষার ধারাকে বজায় রাখব এবং ধীরে ধীরে মানোন্নয়নের দিকে এগোব।

সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। যদি আমরা ভুল পথে এগিয়ে যাই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এই ব্যর্থতার দায় বহন করবে। কিন্তু যদি আমরা সাহসী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে এই সংকটই হতে পারে একটি নতুন শুরুর সুযোগ।

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এই কথাটি শুধু মুখে বললেই হবে না, বাস্তবে তা প্রমাণ করতে হবে। জ্বালানি সংকট হোক বা অন্য কোনো চ্যালেঞ্জ—শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, আর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজ আমরা কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি তার ওপর।

লেখক: প্রফেসর, পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন