চাটুকার-সিন্ডিকেটের এত শক্তির উৎস কোথায়?

চাটুকার-সিন্ডিকেটের এত শক্তির উৎস কোথায়?

ফন্ট সাইজ:

একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিতে পারে দুর্নীতি, চাটুকারিতা, স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট এবং প্রশাসনের অদৃশ্য দুষ্টচক্র। আবার একটি রাষ্ট্রকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতেও হাজার হাজার মানুষের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একজন সৎ, সাহসী এবং নীতিবান কর্মকর্তাই হয়ে উঠতে পারেন পরিবর্তনের প্রতীক।

নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আজ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এটি কেবল একজন কর্মকর্তার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার একটি আয়না।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন মাহমুদা বেগম। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নীতিমালাবহির্ভূত ক্ষতিপূরণ প্রদানের আবেদন বাতিল করেছেন, একের পর এক এলএ কেস পর্যালোচনা করেছেন এবং রাষ্ট্রের সম্ভাব্য অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা অপচয় রোধ করেছেন।

তিন হাজার কোটি টাকা—সংখ্যাটি কেবল একটি অর্থনৈতিক হিসাব নয়; এটি জনগণের করের অর্থ, রাষ্ট্রের সম্পদ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতীক। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সেই কর্মকর্তা আজ প্রশংসার চেয়ে বেশি পেয়েছেন হয়রানি।
সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা বাঁচানোর পরও তিনি স্বস্তিতে নেই। বরং অভিযোগ উঠেছে, যে দুর্নীতির পথ তিনি বন্ধ করেছেন, সেই পথ পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্যই তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, তাকে মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে তিনবার বদলি করা হয়েছে।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি মাহমুদা বেগমকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি মনিটরিং করছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই ভূমি মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে। যদি তাই হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো—এরপরও তাকে তিনবার বদলি করার শক্তি এবং সাহস কারা পেল? কারা এত শক্তিশালী? কারা এত প্রভাবশালী?

কারা এমন ক্ষমতার অধিকারী, যারা একজন মন্ত্রীর অবস্থান, প্রধানমন্ত্রীর মনিটরিং এবং জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করার সাহস দেখায়? তারা কারা? তারা কোথায়? তারা কি সত্যিই সরকারের ভেতরে অবস্থান করা সেই অদৃশ্য সিন্ডিকেট, যারা প্রতিটি সরকারের সময়ে রূপ বদলায় কিন্তু ক্ষমতা হারায় না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা শুধু মাহমুদা বেগমের জন্য নয়; পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য জরুরি। কারণ বিষয়টি যদি সত্য হয়, তাহলে এটি কেবল দুর্নীতির প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন।

একদিকে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন, অন্যদিকে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করা একজন কর্মকর্তা যদি বারবার হয়রানির শিকার হন, তাহলে কোথাও না কোথাও রাষ্ট্রের ভেতরেই একটি প্রতিরোধশক্তি কাজ করছে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। প্রতিটি সরকারের সময়েই এক ধরনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। তারা সরকারের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বড় মনে করে। তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়ায় প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে। তারা নিয়োগ, পদায়ন, বদলি এবং প্রকল্পের আর্থিক প্রবাহকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এরা কখনো প্রকাশ্যে আসে না। তারা সামনে থাকে না। তারা আড়ালে থাকে। কিন্তু তাদের প্রভাব থাকে সর্বত্র। নরসিংদীর ঘটনাটি যেন সেই অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্বকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক প্রভাবশালী ব্যক্তি নীতিমালাবহির্ভূত ক্ষতিপূরণের জন্য তদবির করেছিলেন। মাহমুদা বেগম তাকে সরাসরি ‘না’ বলে দেন। এরপর তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল—“আপনার ক্ষমতা বেশি না আমার ক্ষমতা বেশি দেখতে পাবেন।”এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা। একজন কর্মকর্তা যখন আইনকে অনুসরণ করেন, আর অন্য কেউ যখন ব্যক্তিগত প্রভাবকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন—তখন সেখানে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। মাহমুদা বেগম সেই সংঘাতে আপস করেননি। তিনি আইনকে বেছে নিয়েছেন। রাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছেন। জনগণের স্বার্থকে বেছে নিয়েছেন।
আর সেই কারণেই আজ তিনি শুধু একজন কর্মকর্তা নন; তিনি একটি প্রতীক। সততা, ন্যায় পরায়ণতা এবং অকৃত্রিম দেশ প্রেমের প্রতীক। দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অসৎ হওয়া অনেক সময় লাভজনক, কিন্তু সৎ থাকা ব্যয়বহুল। যেখানে দুর্নীতির সঙ্গে আপস করলে পদোন্নতি আসে, কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালে বদলি আসে।
যেখানে চাটুকারিতা নিরাপদ, কিন্তু সত্য বলা ঝুঁকিপূর্ণ। সেই বাস্তবতায় মাহমুদা বেগম দেখিয়ে দিয়েছেন—রাষ্ট্রের ভেতর এখনো কিছু মানুষ আছেন, যারা নীতি-নৈতিকতা, সততা এবং সাহসকে কেবল বক্তৃতার বিষয় মনে করেন না; বাস্তব জীবনে তার চর্চা করেন।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি একটি দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছেন। আপনি প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলছেন। আপনি রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে আরও জবাবদিহিমূলক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো প্রধানমন্ত্রী একা রাষ্ট্র পরিবর্তন করতে পারেন না। রাষ্ট্র পরিবর্তনের জন্য দরকার মাঠপর্যায়ের সৎ মানুষ। দরকার সেইসব কর্মকর্তা, যারা ক্ষমতাবানদের রোষানলে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবেন। দরকার সেইসব প্রশাসক, যারা রাজনৈতিক তদবিরের চেয়ে আইনকে বড় মনে করবেন।
দরকার সেইসব মানুষ, যারা রাষ্ট্রের অর্থকে নিজের সম্পদ মনে করে পাহারা দেবেন। আজ মাহমুদা বেগম সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি।

আপনার শত পরিকল্পনা, হাজার নির্দেশনা এবং অসংখ্য উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করবেন মাহমুদাদের মতো মানুষই। প্রশাসনের নিচের স্তরে যদি সততা পরাজিত হয়, তাহলে উপরের স্তরের সব পরিকল্পনাই একসময় কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, কোনো সরকার বিরোধী দলের কারণে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিজের চারপাশে গড়ে ওঠা চাটুকার ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর কারণে।
এই গোষ্ঠী বাস্তবতা আড়াল করে। এই গোষ্ঠী সরকারের সাফল্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
এই গোষ্ঠী জনগণ ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই গোষ্ঠী সরকারের নাম ব্যবহার করেই সরকারের ক্ষতি করে। আজ তাই মাহমুদা বেগমের ঘটনাকে কোনো ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমি মনে করি,
এটি নতুন বাংলাদেশের পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখন এটি প্রমাণের সুযোগ—রাষ্ট্র কি সৎ কর্মকর্তার পাশে দাঁড়াবে, নাকি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কাছে আত্মসমর্পণ করবে?

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,আপনার সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নয়; আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে সৎ ও দক্ষ প্রশাসন। আর সেই প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে আপনাকে মাহমুদাদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। তাদের সম্মান দিতে হবে। তাদের কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। এবং একইসঙ্গে জনপ্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির আশ্রয়দাতা, তদবিরবাজ ও চাটুকার সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,যদি প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বিষয়টি মনিটরিং করেন, তাহলে মাহমুদা বেগমকে ১৯ দিনে তিনবার বদলি করার শক্তি কারা পেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই হবে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের প্রথম বিজয়। সুতরাং মাহমুদাকে রক্ষা করুন। মাহমুদাদের সামনে নিয়ে আসুন।
দুর্নীতির দুষ্টচক্র ভেঙে দিন। কারণ নতুন বাংলাদেশের জন্য, আপনার সরকারের সফলতার জন্য,জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য, রাষ্ট্রের অর্থ সুরক্ষার জন্য এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একজন মাহমুদাকেই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন