রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও গভীরে লুকিয়ে থাকে বড় কোনো সংকেত। অনেক সময় একটি তার কাটা পড়া, একটি দরজা খোলা থাকা কিংবা একটি নিরাপত্তা বলয়ের সামান্য ফাঁকও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে জমে থাকা দুর্বলতাকে নগ্ন করে দেয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ নিরাপত্তাসম্পন্ন ‘লাল টেলিফোন’-এর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।
প্রথম দর্শনে এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি, কপার ক্যাবল চুরি কিংবা অবহেলার কারণে ঘটে যাওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যখন দেখা যায় দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কপার ক্যাবল কেটে ফেলা হয়েছে কিংবা উধাও হয়ে গেছে, তখন বিষয়টি আর সাধারণ থাকে না। তখন প্রশ্ন জাগে—এটি কি কেবল চুরি, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো বার্তা লুকিয়ে আছে?
বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা কেবল তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যে যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকট মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, মন্ত্রিপরিষদ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, সেই ব্যবস্থার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
ঘটনার বিবরণ আরও উদ্বেগজনক। ঈদুল আজহার ছুটি শেষে যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়, তখন দেখা যায় বিশেষ নিরাপত্তাসম্পন্ন রেড টেলিফোন অকার্যকর। পরে বিটিসিএলের কর্মকর্তারা তদন্ত করে দেখতে পান সচিবালয়ের পুরোনো ও নতুন ভবনের মধ্যবর্তী বিভিন্ন স্থানে মূল্যবান কপার ক্যাবল কাটা হয়েছে অথবা উধাও হয়ে গেছে। এর ফলে শুধু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সবচেয়ে নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রশাসনিক এলাকায় এমন ঘটনা ঘটল কীভাবে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যদি কপার ক্যাবল কেটে ফেলার মতো ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘটতে পারে, তাহলে আরও বড় কোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি কি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায়?
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, নির্যাতন, নির্বাসন এবং ষড়যন্ত্রের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত এক-এগারোর সময় তারেক রহমানের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা আজও রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ের শারীরিক নির্যাতনের কারণে তার মেরুদণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় তিনি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারেননি, হাঁটতে পারেননি। অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
এই অতীত ইতিহাসকে উপেক্ষা করে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ একজন ব্যক্তি যখন অতীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নিপীড়ন এবং বহুমাত্রিক চাপে আক্রান্ত হয়েছেন, তখন তার নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রকে আরও বেশি সতর্ক হতে হয়। বিশেষ করে যখন তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমান এক ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। হঠাৎ করেই কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন। শিশুদের সঙ্গে কথা বলছেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে করমর্দন করছেন। কখনো কখনো ট্রাফিক সিগন্যালেও অবস্থান করছেন। তার এই আচরণ জনগণের কাছে তাকে আরও গ্রহণযোগ্য ও মানবিক করে তুলেছে।
কিন্তু জনপ্রিয়তা এবং নিরাপত্তা কখনো এক বিষয় নয়। বিশ্বের ইতিহাসে বহু জনপ্রিয় নেতা নিরাপত্তা শিথিলতার কারণে প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি থেকে শুরু করে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো—তালিকাটি দীর্ঘ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরে দেখা গেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামান্য দুর্বলতাই বড় বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থানও নিরাপত্তা ঝুঁকিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্ব, আন্তর্জাতিক স্বার্থের সংঘাত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।
এমন বাস্তবতায় দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এখানে ষড়যন্ত্র বলতে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বোঝানো হচ্ছে না। রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠী, উগ্রবাদী চক্র, বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক কিংবা প্রশাসনের অভ্যন্তরে সক্রিয় কোনো অসাধু গোষ্ঠী—সব সম্ভাবনাই তদন্তের আওতায় থাকা উচিত।
লাল টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাটি তাই একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে—নিরাপত্তা বলয়ের কোথাও না কোথাও দুর্বলতা রয়েছে।
আর এই দুর্বলতা যদি দ্রুত শনাক্ত ও সংস্কার করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয় ঘটতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনাটি ঘটেছে সচিবালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল এলাকায়। যেখানে প্রতিদিন বহু স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকার কথা। সিসিটিভি নজরদারি, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা টহল এবং গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণের মধ্যেও যদি কপার ক্যাবল কেটে ফেলা সম্ভব হয়, তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি চুরির মামলা হিসেবে না দেখা। বরং এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা। কারা এই কাজ করেছে?
কী উদ্দেশ্যে করেছে? কতদিন ধরে এই কার্যক্রম চলছিল? নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোন স্তরে দুর্বলতা ছিল? কেউ কি ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জাতির সামনে আসা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা নিয়ে অস্পষ্টতা কখনোই গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
তারেক রহমান হয়তো ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিতে চান না। তিনি হয়তো জনগণের আরও কাছাকাছি থাকতে চান। একজন গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিমালা ব্যক্তিগত সাহস বা জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাজ করতে হয় সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মাথায় রেখে।
সেই কারণেই লাল টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাষ্ট্রকে সতর্ক করার একটি অ্যালার্ম। এটি মনে করিয়ে দেয় যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর নিয়মিত পর্যালোচনা, আধুনিকায়ন এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার স্বার্থেই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, বড় সংকটের আগে ছোট ছোট সতর্কবার্তা আসে। বুদ্ধিমান রাষ্ট্র সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেয়, আর অবহেলাকারী রাষ্ট্র পরে তার মূল্য চোকায়। সুতরাং লাল টেলিফোনের নীরবতা শুধু একটি টেলিফোন লাইনের নীরবতা নয়; এটি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোরও নীরব প্রতিধ্বনি। সেই প্রতিধ্বনির উত্তর খুঁজে বের করাই এখন রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
