বহুমেরুর নতুন ভোর: বাংলাদেশ কি পারবে ইতিহাসের ডাকে সাড়া দিতে?

বহুমেরুর নতুন ভোর: বাংলাদেশ কি পারবে ইতিহাসের ডাকে সাড়া দিতে?

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বরাজনীতির পর্দা যখন নতুনভাবে টানা হচ্ছে, যখন পুরনো একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিমূল কাঁপছে এবং নতুন শক্তিকেন্দ্রগুলো তাদের দাবি নিয়ে সামনে আসছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হলেন এবং তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর হিসেবে বেছে নিলেন মস্কো। এই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা কেবল একটি দেশের কূটনৈতিক তৎপরতার গল্প নয়, এটি একটি জাতির বৈশ্বিক পরিচয় পুনর্নির্মাণের সুচিন্তিত প্রয়াস।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের আমন্ত্রণে এই সফর নিছক সৌজন্যমূলক নয়। লাভরভ বিশ্বের অন্যতম অভিজ্ঞ কূটনীতিক, যিনি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে সোচ্চার প্রবক্তা। তার সঙ্গে বৈঠকে বসার অর্থ হলো সেই বৈশ্বিক রূপান্তরের কথোপকথনে সক্রিয় অংশীদার হওয়া, যেখানে পশ্চিমা আধিপত্যের বিপরীতে একটি নতুন বিশ্বক্রম তৈরির রাজনৈতিক দর্শন আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সেই কথোপকথনের টেবিলে নিজের চেয়ার টেনে বসেছে এটি ছোট কোনো পদক্ষেপ নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা মূলত পশ্চিমা নকশায় তৈরি হয়েছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও এই প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নশীল বিশ্বকে কাঠামোগত সংস্কারের শর্তে ঋণ দিয়েছে, বাণিজ্যের নিয়ম নির্ধারণ করেছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধনী দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করেছে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও বারবার প্রান্তিক থেকে গেছে। বাংলাদেশ নিজেও এর ব্যতিক্রম নয়। বৈদেশিক ঋণের শর্ত, বাণিজ্য বৈষম্য, প্রযুক্তি হস্তান্তরে অনীহা এবং জলবায়ু অর্থায়নে প্রতিশ্রুতির ফাঁকি এই সব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় ন্যায্যতার জায়গাটি এখনো অনেক সংকীর্ণ।
ব্রিকস সেই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত প্রতিক্রিয়া। ২০০৯ সালে মাত্র চারটি দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই জোট আজ বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে শুরু করেছে। ডলারের আধিপত্য ভেঙে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের যে উদ্যোগ ব্রিকস নিয়েছে, তা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বাংলাদেশ যদি এই জোটের অংশ হতে পারে, তাহলে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো অবকাঠামো খাতে বিকল্প অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বাজার বহুমুখীকরণের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

কিন্তু ব্রিকস সদস্যপদের প্রশ্নটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক। ভারত ব্রিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ২০২৬ সালে জোটটির সভাপতিত্বও করছে। বাংলাদেশের ব্রিকস আকাঙ্ক্ষায় ভারতের অবস্থান তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিস্তা চুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত হত্যা এবং ট্রানজিট ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশের মস্কো সফর এই প্রেক্ষাপটে ভারতকেও একটি বার্তা দেয়: বাংলাদেশ তার কৌশলগত বিকল্পগুলো সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করছে এবং এককভাবে কোনো প্রতিবেশীর উপর নির্ভরশীল থাকতে রাজি নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর চিত্রটি আরও জটিল। পাকিস্তান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে চীনের প্রতি ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে সংকুচিত করছে। শ্রীলঙ্কা ঋণসংকটের পর চীন ও ভারতের মধ্যে দুলছে এবং নিজস্ব কোনো শক্তিশালী অবস্থান নির্মাণে ব্যর্থ হচ্ছে। নেপাল ও ভুটান ভারতের প্রভাববলয়ে থেকে সীমিত কূটনৈতিক পরিসরে কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি অনুসরণ করতে পারে পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ সবদিকে নিজের সম্পর্ক নিজের শর্তে পরিচালনা করতে পারে তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি অনন্য কূটনৈতিক মডেলের প্রবর্তক হতে পারে।

তবে এই উচ্চাভিলাষী কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি ঘরের ভেতরেই। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে এবং এই খাতের প্রধান বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলে জিএসপি সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এই মুহূর্তে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হলে তার অর্থনৈতিক মূল্য হবে অত্যন্ত বেশি। তাছাড়া দেশের ভেতরে বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, দুর্নীতি দমন এবং মানবাধিকারের প্রশ্নগুলো পশ্চিমা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বারবার অস্বস্তি তৈরি করে। বৈশ্বিক মঞ্চে যতই শক্তিশালী কূটনীতি করা হোক না কেন, ঘরের ভেতরের দুর্বলতাগুলো শেষ পর্যন্ত বাইরের শক্তিকে সুযোগ দেয়।

আর্থসামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের একটি বড় অংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি জীবন যাপন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতি, কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা এবং নগর দারিদ্র্য ক্রমশ বাড়ছে। এই মানুষগুলোর জীবনমানের উন্নতির জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার সুবিধা দরকার, তা শুধু একটি শিবিরের দিকে তাকিয়ে থাকলে পাওয়া সম্ভব নয়। পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ সব দিক থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করার সক্ষমতাই হবে বাংলাদেশের কূটনীতির আসল পরীক্ষা। জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায্য হিস্যা আদায়, প্রযুক্তি হস্তান্তরে বৈষম্য দূর করা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এই ইস্যুগুলোতে ইউএনজিএ সভাপতির আসন থেকে কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়া গেলে কূটনীতির সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

ইউএনজিএর সভাপতিত্বের প্রতিপাদ্য "Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All" এই শব্দগুলো কেবল বাগাড়ম্বর নয়, যদি সত্যিকার অর্থে তা বাস্তবায়িত হয়। বিশ্বের দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো, বিশেষত আফ্রিকা ও এশিয়ার উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো, জাতিসংঘে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর প্রতিনিধিত্বের অভাব অনুভব করছে। বাংলাদেশ যদি এই অধিবেশনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, ঋণ পুনর্গঠন, ডিজিটাল বিভাজন দূরীকরণ এবং শান্তিরক্ষায় ন্যায্য বণ্টনের মতো ইস্যুগুলোতে দৃঢ় নেতৃত্ব দিতে পারে, তাহলে এই সভাপতিত্ব কেবল মর্যাদার প্রতীক নয়, বরং বৈশ্বিক পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতিগুলো ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তে সাহসী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে, তারাই পরবর্তী দশকগুলোতে অসামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ভিয়েতনাম এই দেশগুলো বহুমুখী কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ এসেছে। মস্কো সফর, ব্রিকস সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষা এবং ইউএনজিএ সভাপতিত্ব এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বাংলাদেশের জন্য একটি অসাধারণ কৌশলগত মুহূর্ত তৈরি করেছে।

প্রশ্ন হলো, এই মুহূর্তটিকে কি আমরা সত্যিকার অর্থে কাজে লাগাতে পারব? নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অভাব আমাদের আবারও সম্ভাবনার দরজায় দাঁড়িয়ে ফিরে আসতে বাধ্য করবে? বহুমেরুর এই নতুন ভোরে বাংলাদেশের ডাক এসেছে। ইতিহাস উত্তরের অপেক্ষায়।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন