ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তে এখন যা ঘটছে, তাকে শুধু একটি প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা বললে বিষয়টাকে অনেক ছোট করে দেখা হয়। 'পুশ ইন' নামক এই প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার মানুষ না-ঘরকা না-ঘাটকা হয়ে সীমান্তের শূন্যতায় আটকে পড়ছেন। তাঁরা ভারতে ফিরতে পারছেন না, বাংলাদেশেও ঢুকতে পারছেন না। ডিটেনশন সেন্টার আর হোল্ডিং ক্যাম্পে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এই দৃশ্য শুধু মানবিক বিপর্যয়ের নয় এটি একটি গভীরতর কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের উপসর্গ, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে।
বিষয়টির বিপজ্জনক দিক হলো, এই সংকটের উৎস কেবল নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতিতে নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রশাসনের একটি একতরফা ও বেপরোয়া সিদ্ধান্তে। দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক কাঠামোর কথা বলছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব প্রশাসনিক যুক্তিতে মানুষ ঠেলে দিচ্ছে সীমান্তের ওপারে। এই দ্বৈততা কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ শাসন-কাঠামোর দুর্বলতাকে উন্মোচন করে না, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিপজ্জনক সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিতও দেয়। একটি গণতান্ত্রিক ফেডারেল রাষ্ট্রে এই বিভ্রান্তি অনিবার্যভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অস্থিরতা তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক চিত্রটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে "সোনালি অধ্যায়" ছিল, তা ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। এই শূন্যতায় চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ক বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। লালমনিরহাটে বিমানঘাঁটি সংস্কারে চীনের সম্পৃক্ততা, তিস্তা নদী প্রকল্পে চীনের সক্রিয়তা এবং ঢাকা-ইসলামাবাদ-বেইজিং ত্রিভুজের উদ্ভব এগুলো ভারতের কৌশলগত উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় সীমান্তে মানবিক সংকট তৈরি করে বাংলাদেশকে আরও দূরে ঠেলে দেওয়া ভারতের নিজের জন্যই আত্মঘাতী।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সংকটের মূল্য অপরিসীম। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য একটি অপরিহার্য ট্রানজিট করিডোর। ভারতের 'নেইবারহুড ফার্স্ট' এবং 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা যখন চলছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ ও স্থিতিশীলতা না থাকলে সেই চুক্তির সুফলও সীমিত থেকে যাবে। সীমান্তে উত্তেজনা মানে কেবল দুটি দেশের সম্পর্কের অবনতি নয় এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির স্বপ্নকেও বিপন্ন করে তোলে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়া একটি সংকটজনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে চাইছে। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার যেখানে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে, একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রথমে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিশ্বাসের ভিত্তিটি মজবুত করতে হবে।
সীমান্তে যখন স্থানীয় জনগণ বিজিবির সঙ্গে মিলে পুশ ইন প্রতিরোধে নামছেন, তখন বুঝতে হবে উত্তেজনা এখন আর কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেই তা সমাজের গভীরে প্রোথিত হচ্ছে। জনগণের এই ক্ষোভ একটি সংঘাতের বীজ বপন করতে পারে, যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণ করা উভয় সরকারের জন্যই কঠিন হয়ে পড়বে। ইতিহাস সাক্ষী, দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ঢেউ যখন জনমানসে আঘাত করে, তখন সেই ঢেউ ফিরে আসে বহুগুণ শক্তিশালী হয়ে।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো, উভয় দেশকে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক কাঠামোর দিকে ফিরে আসতে হবে। SAARC, BIMSTEC ও BBIN-এর মতো আঞ্চলিক মঞ্চগুলো কার্যকর করতে হবে। অনিয়মিত অভিবাসন একটি জটিল বাস্তবতা, কিন্তু তার সমাধান মানুষকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দেওয়ায় নয় সমাধান আছে পারস্পরিক সংলাপ, যৌথ যাচাই ও মানবিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়তে না পারে, তাহলে বাইরের শক্তিগুলো সেই শূন্যতাকে কাজে লাগাবেই। এই সত্যটি ভারত ও বাংলাদেশ উভয়কেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
ধাক্কার কূটনীতি দিয়ে প্রতিবেশী জয় করা যায় না। যায় কেবল সংলাপে, সম্মানে, আর পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতিতে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
