বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতি ও কৌশল, প্রস্তাবিত বাজেটে যেমন ব্যাখ্যা করা হয়েছে , তা সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, শাসনগত দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার অবনমনের একটি সময়পর্বের পর অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের একটি সচেতন প্রচেষ্টা। বাজেটের রাজস্ব ঘাটতি সংকোচন, রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর জোরের সাথে মিলিয়ে দেখলে, এই কৌশলটি স্বল্পমেয়াদি সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তরের দিকে একটি সমন্বিত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বহু দিক থেকেই এটি উন্নয়ন অর্থনীতিতে আলোচিত সেই সিকোয়েন্সিং লজিকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়—মুদ্রাস্ফীতি ও বহিঃঝুঁকিতে থাকা অর্থনীতিতে প্রথমে স্থিতিশীলতা, পরে গভীর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি- মূলত রডরিক, ড্যানি (২০১৬),(আইএমএফ, ২০২৪)-এর গবেষণা তত্ত্ব এই কৌশলের একাডেমিক ভিত্তি । এই পদ্ধতির কেন্দ্রে রয়েছে সরকারের তিন-ধাপের “থ্রী-আরফ্রেমওয়ার্ক”:১) পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা(রিকোভারিএন্ড স্ট্যাবিলাইজেশন), ২) অর্থনৈতিক পুনর্গঠন (ইকোনোমিকরেস্টোরেশন ),এবং ৩) ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠন (রিকন্সট্রাকশন ফর এক্সিলারেশন )।
প্রথম ধাপটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক অভিঘাত থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষার ওপর কেন্দ্রীভূত। এর প্রধান নীতি উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য, বিনিময় হার ও বৈদেশিক মজুদ স্থিতিশীলকরণ,বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ,সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধাপটি ক্লাসিক্যাল স্থিতিশীলতা তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ,যেখানে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বহিঃসমতা পুনরুদ্ধারকে আস্থা পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হয় (ব্ল্যাঞ্চার্ড,অলিভিয়ার এবং জনসন,ডেভিড আর.(২০১৭),(আইএমএফ,২০২৪)।
দ্বিতীয় ধাপ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, একটি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি হিসেবে প্রায় তিন বছরব্যাপী পরিকল্পিত। এতে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, কর-ভিত্তি সম্প্রসারণ, খেলাপি ঋণ হ্রাস ও ব্যাংক পুনঃমূলধনায়নের মাধ্যমে আর্থিক খাত স্থিতিশীলকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবন এবং মানবসম্পদ, অবকাঠামো, কৃষি ও জ্বালানি উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত। এই ধাপটি অন্তর্জাত প্রবৃদ্ধি তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য মানব সম্পদ,উদ্ভাবন ও প্রাতিষ্ঠানিক গুণগত মানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে-রোমার,পল এম. (১৯৯০),আগিওঁ,ফিলিপ ও হাউইট,পিটার (২০০৯)।একইসঙ্গে এটি সমসাময়িক রাজস্ব সক্ষমতা বিষয়ক গবেষণাতেও প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে দুর্বল কর ব্যবস্থাকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে-বেসলি,টিমোথি এবং পারসন,টরস্টেন (২০২৩)।
তৃতীয় ধাপ, পুনর্গঠন মূলক ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধি, একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরমূলক এজেন্ডা, যার লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি উদ্ভাবন নির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। এতে ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম, জলবায়ু সহনশীলতা, বৈশ্বিক বাজারে গভীর সংযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত। এটি “প্রোডাক্টিভিটি ফ্রন্টিয়ার” সাহিত্যকে প্রতিফলিত করে, যেখানে বলা হয় মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে ইনপুট-নির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে উদ্ভাবন নির্ভর প্রবৃদ্ধিতে যেতে হবে-(বিশ্বব্যাংক,২০২৪)।
প্রস্তাবিত বাজেট এই থ্রী-আরকাঠামোকে কয়েকটি আন্তঃসংযুক্ত নীতি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমর্থন করে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ শক্তিশালীকরণ এবং আমদানি যুক্তিকরণ সরাসরি পুনরুদ্ধার ধাপকে সহায়তা করে। এগুলো আইএমএফ -এর স্থিতিশীলতা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যদিও কিছু গবেষণা সতর্ক করে যে অতিরিক্ত সংকোচনশীল নীতি আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ধীর করতে পারে(আইএমএফ,২০২৪)।
দেশীয় রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার সরকারের উন্নয়ন কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথকীকরণ,ভ্যাটডিজিটালাইজেশন,কর-ভিত্তি সম্প্রসারণ,কর অব্যাহতি হ্রাস এবং সম্মতি উন্নয়নের মাধ্যমে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬.৮ শতাংশ থেকে ৯.৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, দুর্বল রাজস্ব সক্ষমতা উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় বাধা। বেসলি, টিমোথি এবং পারসন, টরস্টেন (২০২৩)তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন,দুর্বল কর ব্যবস্থা রাষ্ট্রের সক্ষমতার অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা,এবং বার্ড, রিচার্ড এম. এবং জোল্ট,এরিক এম. (২০২১)তাদের গবেষণায় ডিজিটাল কর প্রশাসনকে অধিক কার্যকর ও স্বচ্ছ করে বলে উল্লেখ করেছেন।
ব্যয় ব্যবস্থাপনার সংস্কারও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপ্রাধান্য প্রাপ্ত ব্যয় হ্রাস, ভর্তুকি লক্ষ্যভিত্তিক করা এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক বাজেটিং আন্তর্জাতিক সেরা চর্চার প্রতিফলন। একই সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও জ্বালানিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়। তবে রাজনৈতিক অর্থনীতি গবেষণা দেখায়, ভর্তুকি সংস্কার প্রায়ই স্বার্থ গোষ্ঠীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে-কিফার, ফিলিপ (২০১৮)।
আর্থিক খাত সংস্কার কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই উদ্যোগ খেলাপি ঋণ হ্রাস,ব্যাংক পুনঃমূলধনায়ন,কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শক্তিশালীকরণ, ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকি এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। লেভিন, রস (২০০৫)তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, দক্ষ আর্থিক মধ্যস্থতা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। তবে শুধুমাত্র মূলধন ইনজেকশন যথেষ্ট নয়; শাসন সংস্কার না হলে পুনরায় সংকট দেখা দিতে পারে-হনোহান,প্যাট্রিক এবং ক্লিঙ্গেবিয়েল,ড্যানিয়েলা (২০০৩)-এর গবেষণা তা-ই বলেছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ডিরেগুলেশন,ওয়ান-স্টপ সার্ভিস,পুঁজিবাজার উন্নয়ন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ এই অংশে অন্তর্ভুক্ত। নর্থ, ডগলাস সি. (১৯৯০)ও অ্যাসেমোগলু, ড্যারন এবং রবিনসন, জেমস এ. (২০১২)-এর গবেষণা অনুযায়ী, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানগত অনিশ্চয়তা ও লেনদেন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে, তাই নিয়ন্ত্রক দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আগের উন্নয়ন কৌশলের তুলনায় বর্তমান কৌশল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। এটি ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে চায়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর বেশি জোর দেয়; সামষ্টিক অর্থনীতির সমন্বিত কাঠামো তৈরি করে; বেসরকারি খাতকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়; এবং পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা কাঠামো প্রবর্তন করে।
তবে এই নয়া নীতি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও উল্লেখযোগ্য। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির দ্বন্দ্ব, বহিঃঝুঁকি এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিরোধ সংস্কার বাস্তবায়নকে জটিল করে তোলে।
এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্তিশালী বাস্তবায়ন কাঠামো, ব্যাংকিং খাতে গভীর সংস্কার, ভারসাম্যপূর্ণ সামষ্টিক নীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল। একইসাথে ডিজিটাল রাষ্ট্র সক্ষমতা—যেমন সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর ও কাস্টমস ব্যবস্থা, এআই -ভিত্তিক তদারকি,এবং স্বচ্ছ প্রোকিউরমেন্ট—দুর্নীতি ও অদক্ষতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে (বিশ্বব্যাংক,২০২৩)।
পরিশেষে, বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতি ও কৌশল একটি সুসংহত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ঋণ ও আমদানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানিনির্ভর উন্নয়ন মডেলে রূপান্তর। এর শক্তি হলো এর পর্যায়ভিত্তিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অভিমুখিতা। তবে উন্নয়ন অর্থনীতির মূল গুরুরডরিক, ড্যানি (২০১৬),এবং অ্যাসেমোগলু ও রবিনসন (২০১২)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, নীতি নকশা নয়,বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতাই চূড়ান্ত সাফল্য নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ তাই ধারণাগত নয়, বরং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কৌশলগুলো বাস্তবায়ন। বিপুল গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারকে এই বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ যে কোনো মূল্যে মোকাবেলা করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে যাত্রায় এর বাইরে আর কোনো বিকল্প নেই।
