জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হলো দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল আর্থিক রূপরেখা। সংখ্যার বিশালত্বে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, কিন্তু একটু গভীরে তাকালে যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হলো এই বাজেট কি সত্যিই দরিদ্রের ঘরে আলো জ্বালাবে, নাকি এটি কেবল কাগজে-কলমে এক সংখ্যার মহাযজ্ঞ?
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তার পরিধি বিস্তার, ই-হেলথ কার্ড চালু, যুব উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিল এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সরকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে বিদ্যমান কর কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং করদাতার ভিত্তি বিবেচনায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা পূরণ করতে হবে বিদেশি ঋণ ও ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভর করে।
এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে একটি মৌলিক প্রশ্ন সমস্যাটি কি কেবল বাজেটের আকারে, নাকি এর বণ্টনের ধরনে? বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি কাঠামোগত বৈষম্য বিদ্যমান। জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যা যতই উজ্জ্বল দেখাক না কেন, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের নিচের তলায় পৌঁছায় না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অপ্রতুল বরাদ্দ এই বাস্তবতারই প্রতিফলন যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও সুরক্ষা কাঠামো দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই বাজেটকে দেখলে চিত্রটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার ৬.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ভারত এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলেও ভারতকে বাদ দিলে বাকি দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.১ শতাংশ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা প্রতিটি দেশই নিজস্ব আর্থিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি। দক্ষিণ এশিয়া আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ার তুলনায় অনেক পিছিয়ে মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ আঞ্চলিক, যেখানে পূর্ব এশিয়ায় এই হার ৫০ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধানটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফসল।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতির মঞ্চে ২০২৬ সাল এক নতুন বাস্তবতা নিয়ে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে আঞ্চলিক ব্লকের ভিত্তিতে, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিণত হচ্ছে ভূরাজনৈতিক প্রভাবের নতুন হাতিয়ারে। এই পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্বের কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কূটনীতি তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন তার পেছনে থাকে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভিত্তি। বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে দরকার দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ, শ্রমবাজার কূটনীতিতে সক্রিয়তা এবং প্রবাসী আয়কে উৎপাদনশীল খাতে পরিচালিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
"ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি"র স্বপ্ন দেখতে দোষ নেই। কিন্তু সেই পথে এগোতে হলে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটি টাকা সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে কিনা। সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, কর ফাঁকি রোধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং রাজস্ব কাঠামোর আমূল সংস্কার ছাড়া কোনো বাজেটই সে যত বড়ই হোক দেশের মানুষের জীবনমান পরিবর্তন করতে পারবে না। দরিদ্র বণ্টন নয়, প্রয়োজন সম্পদের বণ্টন এই সত্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের দার্শনিক ভিত্তি। সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই তৈরি হতে পারে একটি ন্যায্য, টেকসই এবং সত্যিকারের মানবিক বাজেট।
———————————
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
