তেল নিয়ে তেলেসমাতি আর নয়

তেল নিয়ে তেলেসমাতি আর নয়

ফন্ট সাইজ:

বাজারে যখনই কোনো পণ্যের মূল্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, তখন এক ধরনের অদৃশ্য খেলা শুরু হয়। এটা আমরা সবাই জানি। তবে জ্বালানি তেল নিয়ে খেলাটা সীমা ছাড়িয়ে গেছে—যাকে সহজ ভাষায় বলা যায় ‘তেল নিয়ে তেলেসমাতি’। বাস্তব সংকট যতটা, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি তৈরি করা হয় কৃত্রিম সংকট। আর এই কৃত্রিমতার নেপথ্যে থাকে একটি সুপরিকল্পিত মুনাফার রাজনীতি—যেখানে জনগণের ভোগান্তি কারও কাছে ব্যবসার সুযোগ মাত্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ায় তেল নিয়ে তেলেসমাতি আর সম্ভব হবে না বলেই মনে হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে জ্বালানি তেলকে ঘিরে যে উদ্বেগ, তা একেবারেই অমূলক নয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে একটি অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে দেশের ভেতরে যে অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে, সেটিই আজকের সবচেয়ে বড় সংকট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা যেন সেই বাস্তবতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। গোকর্ণ ঘাট এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে তিনটি দোকান থেকে আনুমানিক ১০ হাজার লিটার ডিজেল ও ১০০ লিটার অকটেন জব্দ করা হয়েছে। অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে তিন ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল তারা কোথা থেকে পেল? কীভাবে তারা অনুমোদন ছাড়াই এটি মজুত করলো? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই তেল বাজারে না এনে কেন লুকিয়ে রাখা হলো? এই প্রশ্নগুলো সমান করে যে—দেশে কেবল সংকট নেই, সংকট তৈরির কারিগরও রয়েছে।

দিনাজপুরের খানসামা, ঘোড়াঘাট কিংবা সিরাজগঞ্জের বেলকুচির ঘটনাগুলো একই চিত্র তুলে ধরে। কোথাও মুদি দোকান থেকে শত লিটার পেট্রোল ও অকটেন, কোথাও ওয়ার্কশপে লুকিয়ে রাখা হাজার লিটার ডিজেল—সবই এক সূত্রে গাঁথা। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অংশ, যেখানে ছোট-বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মধ্যস্বত্বভোগী—সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িত।

এই মজুদদারদের আচরণ কেবল অনৈতিক নয়, এটি সরাসরি অপরাধ। তারা জানে, বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি হলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পণ্য কিনবে। ফলে তারা কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কমিয়ে দেয়, দাম বাড়ায় এবং পরে সেই মজুত পণ্য উচ্চমূল্যে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক প্রতারণা’, যার শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মজুদদারি অনেক ক্ষেত্রে জননিরাপত্তার জন্যও হুমকি। মুদি দোকান, গ্যারেজ বা আবাসিক এলাকায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত রাখা শুধু অবৈধ নয়, এটি অগ্নিকাণ্ডসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থাৎ, এই অসাধু চক্র শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, তারা মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

প্রশাসনের ভূমিকা এখানে অবশ্যই প্রশংসনীয়। র‍্যাব, জেলা প্রশাসন, ভ্রাম্যমাণ আদালত—সবাই মিলে অভিযান চালাচ্ছে, জব্দ করছে, জরিমানা করছে, এমনকি কারাদণ্ডও দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অভিযান যতই চলুক, যদি মজুদদারির সংস্কৃতি বন্ধ না হয়, তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—কেন এই মজুদদারি বন্ধ হচ্ছে না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। আমরা কি এমন একটি সমাজে বাস করছি, যেখানে দ্রুত লাভই একমাত্র লক্ষ্য? যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব গৌণ হয়ে গেছে? যদি তাই হয়, তবে এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি একটি গভীর নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।

জ্বালানি তেলের বাজারে এই ‘তেলেসমাতি’ আসলে একটি বৃহত্তর সমস্যার লক্ষণ। এটি প্রমাণ করে যে,আমাদের বাজার ব্যবস্থায় এখনও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। সরবরাহ চেইনের কোথাও না কোথাও দুর্বলতা রয়েছে, যার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র। এই দুর্বলতা দূর করতে হলে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।

প্রথমত, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। কোথায় কত তেল যাচ্ছে, কে কত পাচ্ছে—এই তথ্যগুলো রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা গেলে মজুদদারি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে কঠোর করতে হবে। অনুমোদন ছাড়া কেউ যেন জ্বালানি তেল বিক্রি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্সধারীদের নিয়মিত তদারকি করতে হবে।

তৃতীয়ত, শাস্তির মাত্রা বাড়াতে হবে। ১০ হাজার বা ২০ হাজার টাকা জরিমানা অনেক ক্ষেত্রে এই অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য তেমন কোনো বাধা নয়। তারা কয়েকদিনেই সেই টাকা তুলে ফেলে। তাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি—যেমন বড় অঙ্কের জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড—প্রয়োগ করতে হবে।

চতুর্থত, ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কে বেশি করে তেল কিনে রাখা আসলে এই মজুদদারদেরই সহায়তা করে। যখন চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন তারা সহজেই বাজারে সংকট তৈরি করতে পারে।

তবে মজুদদারদের জন্য বড় দুঃসংবাদ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংশ্লিষ্ট উত্তেজনা সাময়িকভাবে প্রশমিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে—দেশে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি হয়েছে এবং সরবরাহ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রকৃত সংকটের যে আশঙ্কা দেখিয়ে মজুদদাররা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছিল, তা দ্রুত ভেঙে পড়ছে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটা কমে এলে চাহিদাও হ্রাস পাবে, আর তখন গোপনে মজুত করা তেল আর লাভের উৎস থাকবে না—বরং লোকসানের বোঝায় পরিণত হবে। সুতরাং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা অর্জন আর সম্ভব নয়।

পরিশেষে বলতে চাই, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ‘তেল নিয়ে তেলেসমাতি’ বন্ধ করতে হলে শুধু আইন নয়, মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। আমাদের বুঝতে হবে যে, এই দেশ সবার। সুতরাং এখানে নিজের লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করা চলবে না। আমাদের সম্মিলিত নাগরিক সমাজের প্রতিরোধই হতে পারে অসাধুচক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন