বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু সিদ্ধান্ত থাকে তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক। আবার কিছু সিদ্ধান্ত থাকে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক, কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবে অস্বস্তিকর। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার প্রশ্নটি এখন ঠিক সেই দুই সীমানার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ সংশোধনী অধ্যাদেশকে এবার বিএনপি সরকারের সময় ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। অর্থাৎ, যেটি এতদিন একটি অস্থায়ী প্রশাসনিক-রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল, সেটি এখন প্রাতিষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর অংশ হতে যাচ্ছে। এর ফলে রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের “অস্বাভাবিক সময়ের” সিদ্ধান্ত ছিল না; নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারও সেটিকে বহাল রাখছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা, নাকি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের আইনি রূপ? বিএনপি কি শুধু “বাস্তবতা” মেনেছে?
সরকারের যুক্তি মোটামুটি পরিষ্কার। তাদের ভাষায়, দেশে এখনো আওয়ামী লীগবিরোধী তীব্র জনমত আছে; জুলাই অভ্যুত্থান, সহিংসতা, গুম, দমন-পীড়ন, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং পরবর্তী মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ—এসবের প্রেক্ষাপটে দলটিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া জনমানসে অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। রাজনৈতিক উপদেষ্টারা বলছেন, “এখনো রক্তের দাগ শুকায়নি।”
এই বক্তব্য আবেগতাড়িত, এবং একে একেবারে অস্বীকার করারও উপায় নেই। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের একটি বড় অংশ এখনো আওয়ামী লীগের শাসনামলকে শুধুই একটি রাজনৈতিক সরকারের সময়কাল হিসেবে নয়, বরং দমনমূলক ক্ষমতার এক দীর্ঘ অধ্যায়হিসেবে দেখে। ফলে বিএনপি যদি হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিত, তাহলে সেটি তাদের জন্যও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করত।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি জনরোষ দিয়ে পরিচালিত হবে, নাকি আইনের নিরপেক্ষ শাসনে?
কারণ গণতন্ত্রে জনমত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জনমত কখনোই বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। জনগণের ক্ষোভ একটি রাজনৈতিক সত্য; কিন্তু কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা একটি সাংবিধানিক, আইনি ও নৈতিক সিদ্ধান্ত—এবং সেটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছোট নয়। দলটির বহু শীর্ষ নেতা কারাগারে, শেখ হাসিনাসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারও হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অপরাধগুলো কি ব্যক্তির, নাকি দলের?
যদি বলা হয় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ একটি “সন্ত্রাসী সত্তা” বা “অপরাধী সংগঠন”, তাহলে সেটি প্রমাণ করার মানদণ্ডও হতে হবে অত্যন্ত কঠোর, স্বচ্ছ এবং আদালত-নির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশে সমস্যা হচ্ছে, রাজনৈতিক নৈতিকতা আর ফৌজদারি দায়—এই দুইটিকে বারবার এক করে ফেলা হয়।
কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে অপরাধ, দুর্নীতি, নিপীড়ন, নির্বাচন প্রহসন বা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে—এমন নজির বিশ্বজুড়েই আছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ হলো অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা, পুরো রাজনৈতিক সত্তাকে এমনভাবে নিষিদ্ধ করা নয় যাতে ভবিষ্যতে সেটি অন্যের বিরুদ্ধেও অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
এই কারণেই অনেক আইনজ্ঞ বলছেন, আজ আওয়ামী লীগ, কাল অন্য কেউ।
বিপজ্জনক নজির—যা বিএনপিকেও একদিন তাড়া করতে পারে! বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, ক্ষমতায় থাকা দলগুলো প্রায়ই ধরে নেয় তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—বাংলাদেশে স্থায়ী কিছু থাকলে তা হলো অস্থায়িত্ব।
আজ বিএনপি যে আইনি কাঠামোকে বৈধতা দিল, কাল সেই একই কাঠামো ব্যবহার করে আরেক সরকার চাইলে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি বা অন্য কোনো দলকেও “রাষ্ট্রবিরোধী”, “উসকানিদাতা”, “সহিংসতাসমর্থক” বা “সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট” আখ্যা দিতে পারে। এটাই হলো আইনের রাজনৈতিক ব্যবহার—যার শিকার একসময় সবাই হয়।
বিএনপি একসময় ১৯৭৫-পরবর্তী দলনিষিদ্ধ রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলেছে, রাজনীতির মোকাবিলা রাজনীতিতেই হওয়া উচিত। সেই বিএনপি যদি এখন ক্ষমতায় এসে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার পথকে আইনি বৈধতা দেয়, তাহলে তারা শুধু প্রতিপক্ষকে চাপে রাখছে না—নিজেদেরও একটি নৈতিক অস্বস্তির মধ্যে ফেলছে।
কারণ রাজনীতিতে স্মৃতি খুব দীর্ঘ না হলেও, নজির খুব দীর্ঘস্থায়ী।
তাহলে কি বিএনপি সুবিধাবাদী সিদ্ধান্ত নিল? সোজা উত্তর হলো—সম্ভবত হ্যাঁ, কিন্তু শুধু তাই নয়। বিএনপি এই সিদ্ধান্তে একাধিক রাজনৈতিক হিসাব কষেছে—এমন ধারণা অমূলক নয়। প্রথমত, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলে প্রধান বিরোধী শক্তি কার্যত অনুপস্থিত থাকে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে থাকলে তৃণমূলের ভোট-সমীকরণে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। তৃতীয়ত, জামায়াত ও এনসিপি-ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগবিরোধী জনমতকে সন্তুষ্ট রাখাও বিএনপির জন্য একটি বাস্তব রাজনৈতিক বিবেচনা।
অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্তে নৈতিক অবস্থান যেমন আছে, তেমনি রাজনৈতিক সুবিধাও আছে।
কিন্তু এখানেই বিএনপির জন্য বিপদ। যদি দলটি এই নিষেধাজ্ঞাকে “বিচার ও জবাবদিহির নীতি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, আর সেটি যদি কেবল “রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মাঠের বাইরে রাখার কৌশল” হিসেবে দেখা শুরু হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্তের নৈতিক ভিত্তি দ্রুত ক্ষয়ে যাবে। এবং সেটি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পুরনো নিয়ম আছে: অতিরিক্ত দমন শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে “ভিকটিম” বানিয়ে ফেলে।
আওয়ামী লীগ আজ জনরোষের মুখে, নৈতিকভাবে দুর্বল, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত এবং আইনি চাপে আছে। এই অবস্থায় দলটিকে যদি রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধই রাখা হয়, তাহলে তাদের একটি অংশ ধীরে ধীরে “নিপীড়িত” পরিচয় নিয়ে ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে যদি সাধারণ সমর্থক, তৃণমূল কর্মী বা আদর্শিক ভোটারদের কাছে বার্তাটি যায় যে, “ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো রাজনৈতিক পরিচয়কে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।”
এটি হালকাভাবে নেওয়ার মতো বিষয় নয়। কারণ একটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অপরাধ আর লাখো ভোটারের রাজনৈতিক পরিচয় এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছেন যারা শেখ হাসিনার শাসনকে সমর্থন করেননি, কিন্তু ঐতিহাসিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণে এখনো আওয়ামী লীগের সমর্থক। রাষ্ট্র যদি তাদের কাছে এই বার্তা পাঠায় যে, “তোমাদের রাজনীতির কোনো বৈধতা নেই”, তাহলে তা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির বদলে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াবে।
আর বিচ্ছিন্ন মানুষ কখনো কখনো আরও বিপজ্জনকভাবে রাজনীতিতে ফিরে আসে।
এই পুরো আলোচনার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে তাকে ফেরত চাওয়ার অনুরোধ আবারও তুলেছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ইস্যু। কিন্তু এখানেও একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন আছে—রাষ্ট্র কি বিচার চাইছে, নাকি প্রতীকি রাজনৈতিক নিষ্পত্তি?
যদি বিচারই মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে সেটি হতে হবে এমন প্রক্রিয়ায় যাতে দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে। কারণ শেখ হাসিনার মতো একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে যেকোনো বিচার, রায় বা প্রত্যর্পণ প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়—এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও বিষয়।
এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তটিও অনেকের কাছে “বিচারের নিরপেক্ষতা” নয়, বরং “রাজনৈতিক পরিস্কার অভিযান” বলে মনে হতে পারে। সরকারকে এই ধারণা ভাঙতে হলে শুধু আইন পাস করলেই হবে না; আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষতা, প্রমাণভিত্তিকতা ও স্বচ্ছতা দেখাতে হবে।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এটি অপছন্দের রাজনীতিকেও সহ্য করতে শেখায়—যতক্ষণ না সে আইনভঙ্গ করে। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও এখানেই: গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চাওয়া শক্তিও কখনো কখনো গণতন্ত্রের সুযোগ ব্যবহার করে।
বাংলাদেশ এখন এই দুই সঙ্কটের মাঝখানে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, অভিযোগ, বিচার—সবই বাস্তব। কিন্তু সেই বাস্তবতার প্রতিক্রিয়ায় যদি রাষ্ট্র দল নিষিদ্ধকরণকে স্বাভাবিক শাসনযন্ত্র বানিয়ে ফেলে, তাহলে তা একদিন সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
বিএনপি হয়তো আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনেই এই বিল পাস করেছে। কিন্তু ইতিহাসে এই সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হবে অন্য প্রশ্নে: তারা কি বিচার ও জবাবদিহির পথ শক্তিশালী করেছে, নাকি প্রতিশোধ ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে?
এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একটি স্পষ্ট নীতি: অপরাধী ব্যক্তি ও অপরাধী কর্মকাণ্ডের বিচার হবে—কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আইনের শাসনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
বাংলাদেশ কি সেই পরিণতিতে পৌঁছাতে পারল? এখন পর্যন্ত উত্তরটি স্বস্তিদায়ক নয়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ: জনরায়, নাকি রাজনৈতিক হিসাব
নিয়াজ মাহমুদ
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
৯ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ১১ঃ১৮ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

Bipresh Chandra Sarkar
২ মাস আগেআপনার মন্তব্যে মোটামুটি সঠিক বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু যে দল ক্ষমতায় থাকার সময়ে ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে একটি দলকে নিশ্চিন্ন করতে চায় সেই দলটি এরকম একটা সুযোগ সহজেই হাতছাড়া করবে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। অপরপক্ষে এর মাধ্যমে বিএনপি মাইনাস টু ফর্মুলা কার্যকর করার জন্য কুশলীবরা যে চেষ্টা করছে তাকে আরো বেগবান করে নিজেদেরকে মাইনাস করতে সহায়তা করল।