যুদ্ধবিরতির ঘোষণা: শান্তির দ্বার নাকি কৌশলগত বিরতি?

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা: শান্তির দ্বার নাকি কৌশলগত বিরতি?

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল দাবা খেলায় আবারও নতুন এক চাল দেখা গেল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় এমন ঘোষণাকে নিছক শান্তির বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ মধ্যপ্রাচ্য এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে বহুমাত্রিক কৌশল, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক চাপ এসবের প্রেক্ষাপটে এমন সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রশ্নের জন্ম দেয়।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার শর্তটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই জলপথ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণরেখা। ফলে এটি খোলা রাখা মানে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থও সুরক্ষিত রাখা। কাজেই, এই যুদ্ধবিরতি কেবল মানবিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই স্থায়ী শান্তির দিকে নিয়ে যাবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে রূপ নেয় না। পারস্পরিক অবিশ্বাস, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে শান্তি প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এখানে পাকিস্তানের ভূমিকাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শেহবাজ শরিফ সরকারের মধ্যস্থতা আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তরিকতার ওপর।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে’ এমন দাবি রাজনৈতিক বার্তা বহন করলেও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করলেই যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এমন ধারণা ইতিহাস বারবার ভুল প্রমাণ করেছে।

ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা নাকি আলোচনার একটি ভিত্তি হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, এই দুই সপ্তাহ একটি ‘পরীক্ষার সময়’। এই সময়ে যদি আস্থা তৈরি হয়, তবে হয়তো দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি হতে পারে। আর যদি তা না হয়, তবে এটি কেবল আরেকটি কূটনৈতিক বিরতি হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।

বিশ্ব এখন অপেক্ষায় এই ঘোষণার পেছনে কি সত্যিই শান্তির আন্তরিকতা আছে, নাকি এটি কেবল সময় কেনার এক কৌশল? উত্তরটি নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর।

(লেখক সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন