ইনফান্তিনোকে ঘিরে যত বিতর্ক

বিশ্বকাপ কর্নার

ইনফান্তিনোকে ঘিরে যত বিতর্ক

ফন্ট সাইজ:

ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ এখন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৪৮টি দল ১০৪টি ম্যাচে লড়াই করছে খেলাটির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে। ছয় সপ্তাহব্যাপী এই আসরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সুইস-ইতালীয় জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি ফিফা’র সভাপতি এবং বহু বিলিয়ন ডলারের একটি বাণিজ্যিক ও ক্রীড়া সাম্রাজ্যের প্রধান, যার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে কেবল অলিম্পিক। ইনফান্তিনো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, রাজনীতিকে ফুটবলের বাইরে থাকতে হবে, আর ফুটবলকেও রাজনীতির বাইরে থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে রাজনীতি যেন ইনফান্তিনোর পিছু ছাড়েনি। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেছে মধ্যপ্রাচ্যে।

২০১৬ সালে দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত সাবেক সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ফিফা’র সভাপতি হওয়ার পর, উয়েফা’র সাবেক এই কর্মকর্তা শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা দিতে প্রীতি ম্যাচ এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক করমর্দনের আয়োজন করে আসছেন।
ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ইস্যুতে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস-এর সঙ্গে চুক্তি করা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থাকা দেশগুলোতে টুর্নামেন্ট আয়োজন ও প্রচারের কারণে ইনফান্তিনো সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত সম্পর্কও গভীর। তার স্ত্রী লিনা আল-আশকার লেবাননের নাগরিক। এ ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের কাছ থেকে ইনফান্তিনো লেবাননের নাগরিকত্বও লাভ করেন।
বর্তমান বিশ্বকাপের আসর নকআউট পর্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে, মধ্যপ্রাচ্যে ইনফান্তিনোর ভূমিকা ও কর্মকাণ্ডের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হলো।

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬
২০১৭ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ছয়টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দেশগুলো হলো: ইরান, লিবিয়া, সিরিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেন। (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত ৭৫টি দেশে সমপ্রসারিত হয়।)
২০১৭ সালের মার্চে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সতর্ক করে বলেছিলেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে কোনো দেশের বিশ্বকাপ আয়োজনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনি বলেন, যে দলগুলো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, তাদের অবশ্যই আয়োজক দেশে প্রবেশের সুযোগ থাকতে হবে। অন্যথায় সেটি বিশ্বকাপ হতে পারে না। এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে বলা নয়। এটি কেবল একটি সাধারণ ক্রীড়াগত নীতিমালা।

ইনফান্তিনোর এই মন্তব্য ছিল অত্যন্ত সতর্কভাবে বাছাই করা। কারণ, এর ঠিক পরের মাসেই যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের বিড ঘোষণা করে। পরে ২০১৮ সালের জুনে মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে যৌথভাবে সেই আয়োজনের স্বত্ব পায় দেশটি।
তবে ওই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আট বছর পরও দেখা যায়, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ৭৮টি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ অভিযানে তেহরানে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার পরও ইরান জাতীয় দল তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো লস অ্যানজেলেসে খেলেছে।

কিন্তু মার্কিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক ইরানি সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। এ নিয়ে ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোয়েই ফিফা ও ইনফান্তিনোর কঠোর সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হয়েছে আমাদের দল।
গালেনোয়েইর দাবি, প্রথম ম্যাচের পর ইনফান্তিনো তাদের ড্রেসিংরুমে এসে খেলোয়াড়দের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে “অবিলম্বে” মেক্সিকোতে দলের অনুশীলন ক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনাও অন্য কেউ ঠিক করে দিচ্ছে।

এদিকে ফিফা-নিযুক্ত সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, তার বিরুদ্ধে “সন্ত্রাসী সংগঠনের সন্দেহভাজন সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার” অভিযোগ রয়েছে।
যদিও ফিফা আরতানকে পুরো টুর্নামেন্টের পারিশ্রমিক পরিশোধ করেছে। এ ছাড়া উয়েফা তাকে আগামী আগস্টে অনুষ্ঠিতব্য উয়েফা সুপার কাপ ম্যাচে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন (পিএসজি) ও অ্যাস্টন ভিলার মধ্যকার খেলা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরাকের স্ট্রাইকার আইমান হুসেইন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় আটক হন এবং প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর দেশে প্রবেশের অনুমতি পান। পরে তিনি নরওয়ের বিপক্ষে ইরাকের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে গোল করেন।

ইনফান্তিনো এবং পুরস্কার-লোভী প্রেসিডেন্ট
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে প্যারাগুয়েতে অনুষ্ঠিত ফিফা’র বার্ষিক কংগ্রেসে ইনফান্তিনো কয়েক ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছালে সদস্য দেশগুলোর কয়েকজন প্রতিনিধি সভা থেকে বেরিয়ে যান। তার দেরিতে আসার কারণে কংগ্রেসের কার্যক্রমও বিলম্বিত হয়।
সে সময় ইনফান্তিনো মধ্যপ্রাচ্য সফরে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী ছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি সৌদি আরব ও কাতারের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়ে উয়েফা ও ফিফা।
উয়েফা অভিযোগ তোলে, ইনফান্তিনো ফুটবলের স্বার্থের চেয়ে “ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থকে” অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে ইনফান্তিনো এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিমানের বিলম্বের কারণেই তিনি দেরিতে পৌঁছেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বকাপ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল। আমি মনে করেছি, ফুটবল এবং আপনাদের সবার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সেখানে আমার উপস্থিত থাকা প্রয়োজন ছিল। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহের জন্য পরিচিত।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো ট্রাম্পের হাতে প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেন।
ইনফান্তিনো বলেন, বিশ্ব জুড়ে “শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের অসাধারণ ও ব্যতিক্রমী ভূমিকার” স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তিনি অবিশ্বাস্য উপায়ে এটি অর্জন করেছেন। মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনি সবসময় আমার সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে পারেন।”
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন ইনফান্তিনো। তিনি ফার্স্টলেডি মেলানিয়াকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘মেলানিয়া’-এর প্রিমিয়ারেও অংশ নেন।
অন্যদিকে, ফিফা নিউ ইয়র্কের ফিফথ এভিনিউয়ে অবস্থিত ট্রাম্প টাওয়ারে একটি অফিসও ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করছে।

ইনফান্তিনো এবং কাতার ২০২২-এর সেই ভাষণ
২০১০ সালে ফিফা’র প্রতিনিধিরা ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব কাতারকে দেয়। তখনো জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ফিফার সভাপতি হননি; তিনি দায়িত্ব নেন ২০১৬ সালে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ শুরুর আগে কাতারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, বিশ্বকাপের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছে কাতার- যাকে অনেকে “স্পোর্টসওয়াশিং” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাতারে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে বিশ্বকাপের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন।
এ ছাড়া কাতারের প্রচণ্ড গরমে গ্রীষ্মকালে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়। পরে আবহাওয়ার কারণে টুর্নামেন্টটি শীতকালে অনুষ্ঠিত হয়।
ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ২০২২ সালের ১৯শে নভেম্বর, বিশ্বকাপ শুরুর আগের দিন, ইনফান্তিনো প্রায় ৫৭ মিনিটের দীর্ঘ বক্তব্য দেন।

সেখানে তিনি বলেন, আজ আমার অনুভূতি খুবই প্রবল। আজ আমি নিজেকে কাতারি, আরব, আফ্রিকান মনে করছি। আজ আমি সমকামী মনে করছি। আজ আমি প্রতিবন্ধী মনে করছি। আজ আমি নিজেকে একজন অভিবাসী শ্রমিক মনে করছি।
ইনফান্তিনো কাতারের সমালোচকদেরও জবাব দেন। তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশের লাখো শ্রমিক কাতারে এসে বৈধভাবে কাজ করছেন, আগের তুলনায় অনেক বেশি আয় করছেন এবং নিজেদের পরিবারকে সহায়তা করছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, অনেক সংস্থা স্বীকার করেছে যে, এখানে শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মান পশ্চিম ইউরোপের মানের সঙ্গে তুলনীয়। তবে ইনফান্তিনোর এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করে, ইনফান্তিনো তার সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন সম্ভব করতে যে বিপুল মূল্য অভিবাসী শ্রমিকদের দিতে হয়েছে এবং এ বিষয়ে ফিফা’র নিজস্ব দায় রয়েছে- তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছেন।
অন্যদিকে কাতার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে বর্ণবাদী এবং “দ্বৈত মানদণ্ডের” প্রতিফলন বলে দাবি করে। তাদের বক্তব্য ছিল, অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে একই ধরনের কঠোর সমালোচনা করা হয়নি। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো কাতারের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি।
ইনফান্তিনো ২০২৩ সালেও একটি বক্তব্যের কারণে সমালোচিত হন। নারী ফুটবল নিয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন,
আমি সব নারীকে বলছি- আপনারা জানেন, আমার চার মেয়ে আছে, তাই এ বিষয়ে কিছুটা অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি সব নারীকে বলতে চাই, পরিবর্তন আনার ক্ষমতা আপনাদের রয়েছে। তবে সঠিক লড়াই বেছে নিন, সঠিক ইস্যুতেই সংগ্রাম করুন। তার এই মন্তব্যও অনেকের কাছে নারীদের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতামূলক ও বিতর্কিত বলে বিবেচিত হয়।

২০৩০ সালের মরক্কোর প্রস্তাব
১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল উরুগুয়েতে। এতে মাত্র ১৩টি দল অংশ নিয়েছিল। তাই বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ২০৩০ সালের আসর কোথায় অনুষ্ঠিত হবে- এ নিয়ে ছিল ব্যাপক আগ্রহ।
আয়োজনের জন্য একটি যৌথ প্রস্তাব দেয় উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, চিলি ও প্যারাগুয়ে, যা ঐতিহাসিক আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। অন্যদিকে পর্তুগাল ও স্পেন যৌথভাবে বিড জমা দেয়; একপর্যায়ে এ প্রস্তাবে ইউক্রেনও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে মরক্কোও নিজস্ব বিড ঘোষণা করে। এর আগে দেশটি ছয়বার বিশ্বকাপ আয়োজনের চেষ্টা করেও সফল হয়নি। গত দুই দশকে মরক্কো ফুটবলকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়েছে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠে মরক্কো। এ ছাড়া ২০২৬ সালে বিতর্কিত ফাইনালের মধ্যদিয়ে আয়োজক ও চ্যাম্পিয়ন-দুই-ই হয় আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে।
২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষদিকে প্রকাশিত কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, মরক্কো-পর্তুগাল-স্পেনের যৌথ বিড প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

এরপর ২০২৪ সালের ১১ই ডিসেম্বর অনলাইনে অনুষ্ঠিত ফিফা’র বিশেষ কংগ্রেসে সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ঘোষণা দেন, ২০৩০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হবে মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্‌যাপনে দক্ষিণ আমেরিকায় তিনটি ম্যাচ আয়োজন করা হবে।
তবে এই ঘোষণার আড়ালে কয়েক বছরের রাজনৈতিক তৎপরতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। ফিফা’র নিয়ম অনুযায়ী, সংস্থাটির বিড প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষ থাকার কথা।
কিন্তু ফাঁস হওয়া বার্তায় দেখা যায়, ২০১৮ সালেই ইনফান্তিনো মরক্কোকে স্পেন-পর্তুগালের যৌথ বিডে যুক্ত করার ধারণা দিয়েছিলেন।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি লুইস রুবিয়ালেসকে পাঠানো এক বার্তায় লেখেন, আপনি এবং ইনফান্তিনো যে ধারণাটি আমাকে দিয়েছিলেন, আমি সেটির প্রশংসা করেছিলাম।
জবাবে রুবিয়ালেস লেখেন, ফিফা যেহেতু একটি নিরপেক্ষ সংস্থা, তাই এমনটি প্রকাশ পাওয়া উচিত নয় যে, তারা এ বিষয়ে সম্মত।
তবে ফিফা দাবি করে, বিশ্বকাপের বিডসংক্রান্ত আলোচনায় ইনফান্তিনোর কোনো ভূমিকা ছিল না।
অনেকে আফ্রিকার কোনো দেশ দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পাওয়াকে স্বাগত জানান। এর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। অন্যদিকে সমালোচকেরা মরক্কোর মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং পশ্চিম সাহারা দখল করে রাখার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এসব সমালোচনার জবাবে ইনফান্তিনো বলেন, যারা মরক্কোতে যাবেন, তারা এমন আতিথেয়তা পাবেন যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এটি হবে মানবতা, ফুটবল এবং ঐক্যের এক বিশাল উদ্‌যাপন।
এদিকে আগামী মার্চে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত হবে ফিফা’র পরবর্তী কংগ্রেস। সেখানে চতুর্থ মেয়াদের জন্য ফিফা সভাপতির পদে নির্বাচন করবেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

ইনফান্তিনো ২০৩৪ সাল সৌদির হাতে তুলে দিলেন
একই ফিফা কংগ্রেসে ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব সৌদি আরবকে দেয়া হয়, যা নিয়ে ফিফা ইনফান্তিনো নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন।
ফিফা’র নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বকাপের আয়োজন ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ঘুরে আসে। কোনো কনফেডারেশনকে পুনরায় আয়োজক হতে হলে অন্তত দু’টি বিশ্বকাপ চক্র অপেক্ষা করতে হয়।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা)। আর ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হবে ইউরোপ (স্পেন ও পর্তুগাল), আফ্রিকা (মরক্কো) এবং দক্ষিণ আমেরিকার (উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে) যৌথ আয়োজনে।

সে হিসেবে ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য কেবল এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চল যোগ্য ছিল। ২০২৩ সালের ৬ই অক্টোবর হঠাৎ করেই ২০৩৪ বিশ্বকাপের বিড আহ্বান করে ফিফা এবং আবেদন জমা দেয়ার জন্য মাত্র ২৫ দিনের সময় দেয়।
একই দিন সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে বিড ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলাধুলা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা চালিয়ে আসা দেশটি শেষ পর্যন্ত একমাত্র প্রার্থী হয়ে যায়, কারণ শেষদিনে অস্ট্রেলিয়া, একমাত্র সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী, বিড থেকে সরে দাঁড়ায়।

ফিফা কংগ্রেসে প্রতিনিধিদের ২০৩০ ও ২০৩৪ দুই বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচন একসঙ্গে অনুমোদনের জন্য ভোট দিতে বলা হয়। অর্থাৎ, একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে অন্যটিও বাতিল হয়ে যেত।
সৌদি আরব একমাত্র প্রার্থী হওয়ায় ইনফান্তিনো প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি এখন আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, করতালির মাধ্যমে ২০৩০ সালের শতবর্ষের বিশ্বকাপ এবং ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোকে অনুমোদন দিন। যদি সম্মত থাকেন, তাহলে করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানান।
কয়েক সেকেন্ড করতালির পর ইনফান্তিনো ঘোষণা করেন, কংগ্রেসের ভোট স্পষ্ট এবং জোরালো। পরে সৌদি আরবকে স্বাগতিক ঘোষণা করে তিনি বলেন, ফিফা বিশ্বকাপ অবশ্যই সৌদি আরবে সামাজিক উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ২১টি মানবাধিকার সংগঠন। যৌথ বিবৃতিতে তারা ফিফা’র এই সিদ্ধান্তকে “মানবাধিকারের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক মুহূর্ত” বলে অভিহিত করে।

ইরাক, ইরান, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে ইনফান্তিনোর ভূমিকা
২০১৮ সালে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ১৯৮৬ সাল থেকে চলা ইরাকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এরপর ইরাক বসরা ও কারবালায় বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ আয়োজন করে এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো জায়গা নিশ্চিত করে। তবে বাগদাদে এখনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি নেই।
২০১৯ সালে ইনফান্তিনো ইরানকে ফুটবল স্টেডিয়ামে নারীদের প্রবেশাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান। সাহার খোদায়ারির মৃত্যুর পর ফিফা’র চাপে ইরান সীমিত পরিসরে নারীদের ম্যাচ দেখার অনুমতি দেয়, যদিও এখনো তা নির্দিষ্ট ম্যাচ ও সীমিত সংখ্যক টিকিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

ইনফান্তিনো ফুটবলের মাধ্যমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন। ২০২১ সালে তিনি ভবিষ্যতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যৌথভাবে ইসরাইলে বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাবনার কথাও বলেন।
২০২৩ সাল থেকে গাজায় অভিযানের পর ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। তবে ২০২৬ সালে ইনফান্তিনো বলেন, ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা হবে “পরাজয়”।
২০২৬ সালের মার্চে ফিফা দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি ক্লাবগুলোর খেলা নিয়ে ইসরাইলের ফুটবল এসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরিবর্তে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ফুটবল এসোসিয়েশনের মধ্যে সংলাপ ও মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেয়।

২০২৬ সালের এপ্রিলে ফিফা কংগ্রেসে ইনফান্তিনো ফিলিস্তিন ফুটবল এসোসিয়েশনের সভাপতি জিবরিল রাজুবকে ইসরাইলি প্রতিনিধির সঙ্গে করমর্দন করতে উৎসাহিত করেন। তবে রাজুব তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমরা কষ্টে আছি।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন