ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার বহু এলাকায় এখনো উল্লেখযোগ্য সরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদেরই নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধার কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি বন্দরনগরী লা গুয়াইরা। সেখানে বিবিসি দেখেছে, মানুষ ক্রোবার, বড় হাতুড়ি ও গাঁইতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে নিজেদের স্বজন ও প্রতিবেশীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এখনো কয়েক হাজার নয়, দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। সোমবার ভোরে একটি আফটারশক নতুন করে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যদিও এতে নতুন করে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, এই দুর্যোগ ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এতে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে সোমবার ভোরে ২১ বছর বয়সী এক যুবককে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। গত বুধবার মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প উত্তরাঞ্চলের লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে আঘাত হানে। এতে প্রায় ৮০০টি ভবন ধসে পড়ে। সোমবারের আফটারশকটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬। এতে আবারও কেঁপে ওঠে লা গুয়াইরা এবং রাজধানী কারাকাস।
পাশের কাতিয়া লা মার এলাকাতেও উদ্ধারকাজের বড় অংশ এখনো স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর হাতে রয়েছে। সেখানে সরকারি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর রাস্তায় ভেনেজুয়েলার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেখা গেলেও ধ্বংসস্তূপে তাদের তেমন উপস্থিতি নেই।
মাত্র এক জোড়া দস্তানা ও একটি নিরাপত্তা হেলমেট পরে ধ্বংসস্তূপে কাজ করা ৩২ বছর বয়সী বিদ্যুৎকর্মী রুবেন রোহাস বলেন, সিভিল প্রোটেকশনের লোকজন সাহায্য করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। সরকার সেগুলো দিচ্ছে না। তারাও আমাদের মতোই খালি হাতে কাজ করছেন। লা গুয়াইরা শহরে ভারী খননযন্ত্রের ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত এবং অনিয়মিত। স্থানীয় বাসিন্দারা দিনের পর দিন একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে কাজ করেছেন, অথচ ভারী যন্ত্রপাতি এসেছে তখন, যখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ৩৯ বছর বয়সী ক্যারোলিন জেরপা নিজের বাবা ও ভাইকে ধ্বংসস্তূপের নিচে হাত দিয়ে খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, শুধু একটি গাঁইতি দিয়ে আসলে তেমন কিছুই করা যায় না। তিনি জানান, এখন তার লক্ষ্য আর কাউকে জীবিত উদ্ধার করা নয়; বরং পরিবারের সদস্যদের মরদেহ খুঁজে বের করে সম্মানের সঙ্গে দাফনের ব্যবস্থা করা।
গত ১৫ বছর ধরে লা গুয়াইরায় বসবাসকারী জুলি মারিন বলেন, এত বড় দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়তো সম্ভব ছিল না। তবে সরকারের ধীরগতির প্রতিক্রিয়া এবং ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। তিনি বলেন, আমি আমার ভাতিজি এবং দুলাভাইকে হারিয়েছি। আমার বিশ্বাস, উদ্ধারকারী দল ও খননযন্ত্রগুলো যদি আরও আগে পৌঁছাতো, তাহলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো যেত। কারাকাসের পশ্চিমে পাহাড়ি এলাকা এল জুনকিতোর বাসিন্দারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সেখানে খুব কম সরকারি কর্মকর্তাকে দেখা গেছে। বরং স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষই একে অপরের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা জোগাড় করছেন।
জাতিসংঘের আবাসিক মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা দেল তিন্দারো সোমবার জানান, বুধবারের ভূমিকম্পের পর থেকে ৫০০টিরও বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। প্রাথমিক ভূমিকম্পে কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার অধিকাংশই পুরোপুরি ধসে পড়েছে। তিনি জানান, উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ ১০ হাজার মরদেহ রাখার ব্যাগ সংগ্রহ করছে। তার মতে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে, এটি প্রায় অনিবার্য।
