সিলেটে কফিনে ৫ প্রবাসীর লাশ, গ্রামে গ্রামে মাতম

সিলেটে কফিনে ৫ প্রবাসীর লাশ, গ্রামে গ্রামে মাতম

ফন্ট সাইজ:

সিলেটের গাছবাড়ি। ঘরে ঘরে প্রবাসী। বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক। দুবাইয়ে বেশি। এরপরের অবস্থান সৌদি আরব ও কাতার। ভাগ্য বদলাতে ওই এলাকার মানুষজন দলে দলে প্রবাসী হয়েছেন। ২১শে জুন কাতারের শাহানিয়া এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ওই এলাকার ৫ প্রবাসী। একসঙ্গে, একই গাড়িতে থাকায় তারা ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। সেই থেকে শোকের পরিবেশ গাছবাড়িতে। গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হাঁটলে মাঝে মাঝে কানে আসে কান্নার শব্দ। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই গাছবাড়িতে শোকের পরিবেশ। লাশ আসছে বাড়িতে। ভোর থেকেই কান্না আর কান্না। চিরতরে হারিয়ে গেছেন ৫ প্রবাসী। স্বপ্নের দেশে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে। এমন ঘটনায় শুধু গাছবাড়িই নয়, সিলেটেও শোকের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। আর গতকাল সেই শোকের দেখা মিললো ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। কাতারের দোহা থেকে মধ্যরাতে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে রওয়ানা দেয় প্রবাসীদের ৫টি কফিন। ভোর থেকেই বিমানবন্দরে অপেক্ষা।

স্বজনরাও এসেছে। ৫টি লাশবাহী গাড়ি প্রস্তুত। সকাল ৮টায় বিমান এলো। কফিনবন্দি লাশ সিলেটে পৌঁছলো। কফিন কোনটি কার, তখনো বোঝা যায়নি। তবে কফিন দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। কথা রাখলেন সিলেটের রাজনীতিবিদ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। ঘটনা শোনার পরপরই বলেছিলেন- প্রবাসীদের লাশ সরকারি খরচে সিলেটে নিয়ে আসা হবে। প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে ৯ দিন। ঠিক ১০ দিনের মাথায় লাশ এসে পৌঁছলো সিলেটে। মন্ত্রণালয় থেকে সব ব্যবস্থা আগেই ঠিক রাখা হয়েছিল। লাশ এনে একেক করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করলেন বিমানবন্দরে থাকা প্রবাসী কল্যাণ ডেক্সের কর্মকর্তা তাজউদ্দিন। মানবজমিনকে জানিয়েছেন- লাশ সরকারি খরচে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দাফন সহ অন্যান্য খরচের জন্য আরও ৩৭ হাজার টাকা করে একেক পরিবারকে দেয়া হয়েছে। আরও তিন লাখ টাকা করে সরকারের পক্ষ থেকে ওই প্রবাসী পরিবারদের দেয়া হবে। লাশ গ্রহণে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন সিলেট-৫ আসনের এমপি মুফতি আবুল হাসান। জানালেন- এ ঘটনার পর সংসদে নিহত পরিবারের সদস্যদের জন্য কর্মসংস্থানসহ নানা সুবিধা বাড়াতে দাবি জানানো হয়েছে। মন্ত্রী সেটি গ্রহণ করেছেন। এ ব্যাপারে দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লাশ গ্রহণের সময় সাংবাদিকদের জানান- প্রধানমন্ত্রী প্রবাসীদের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। ঘটনার পর তার নির্দেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী দ্রুতই লাশগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করেন। বর্তমান সরকার সবসময় প্রবাসীদের পাশে আছে বলে জানান তিনি। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে একসঙ্গে ৫ প্রবাসীর মরদেহ পৃথক লাশবাহী গাড়িযোগে বাড়িতে পাঠানো হয়। গাছবাড়ি এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন- এত লাশের বোঝা বহন করার ক্ষমতা এলাকার মানুষের নেই। সবাই কাঁদছেন। প্রবাসীদের লাশ দেখতে এলাকার মানুষ বাড়ি বাড়ি ভিড় করেন। এ সময় এলাকায় এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয় বলে জানান তারা। ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা। কানাইঘাটের গাছবাড়ি অঞ্চলে অন্যরকম এক দৃশ্য।

এক এক করে পাঁচটি লাশবাহী এম্বুলেন্স পৌঁছেছে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে। এম্বুলেন্স থেকে স্বজনেরা প্রিয়জনের নিথর দেহ নামাচ্ছেন আর সেখানকার পরিবেশ কান্নার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে। সন্তানদের আর্তচিৎকার- ‘আব্বু গো-আব্বু গো’ আওয়াজে আকাশ-বাতাস নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। স্ত্রী আর মা-বাবার বিলাপে আশপাশে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কে কাকে সান্ত্বনা দিবে, আর শান্তই বা কীভাবে হবে যারা ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি তারা আজ সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় উপজেলার ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়নের চারজন ও বাণীগ্রাম ইউনিয়নের একজন সহ মোট পাঁচজন সেখানে ঘটনাস্থলেই ইন্তেকাল করেন। এরা হলেন- আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের ছেলে জিবাল উদ্দিন, মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন, আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মোস্তাক আহমদ, একই গ্রামের মৃত মড়া মিয়ার ছেলে জুবায়ের আহমদ এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ি গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদের আহমদ।

আধা ঘণ্টার মতো এসব মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে রাখা হয়; তারপর নিয়ে আসা হয় আকুনি মাদ্রাসা মাঠে জানাজার জন্য। বাদ জোহর হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে তাদের নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন সংসদ সদস্য মুফতি মাওলানা আবুল হাসান। পাঁচ প্রবাসীর সম্মিলিত জানাজা শেষে নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়েছে। আগতালুক গ্রামের জিবালের মা ছেলের লাশ দেখে অঝোরে কাঁদছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল জিবাল। সে টাকা পাঠালে বাজার হতো। এরপর চুলায় আগুন জ্বলতো। মা জানালেন- এখন জিবালের ৫টি সন্তান, স্ত্রী সহ তাদের ভরণপোষণের খরচ কে দেবে? স্থানীয় ঝিঙাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার আবু বক্কর জানালেন- তার এলাকায় কয়েক হাজার প্রবাসী রয়েছেন। একসঙ্গে ৫ জনের লাশ কখনো এভাবে দেশে আসেনি। এমন ঘটনায় এলাকার মানুষ শোকাহত হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে অসহায় প্রবাসীদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও সবাই চিন্তিত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন