এক মুহূর্তের ভুল শেষ করে দিতে পারে সব স্বপ্ন, আর এক মুহূর্তের জাদু লিখে দিতে পারে ইতিহাস। আর্লিং হালান্দ সেটাই যেন করে দেখালেন। তার এক মুহুর্তের জাদুতেই নতুন ইতিহাস লিখলো নরওয়ে। ১৯৯৮ সালে নরওয়ে দলে খেলেছিলেন বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্দ। সেবারও শেষ ১৬-তে জায়গা পেয়েছিল নরওয়ে। ২৮ বছর পর নরওয়ের বিশ্বকাপ প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে তুললেন হালান্দ।
উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ৩৯ মিনিটে আন্তোনিও নুসার দারুণ এক গোলে প্রথমে লিড পায় নরওয়ে। দ্বিতীয়ার্ধের ৭৪ মিনিটে আরেকটি অসাধারণ গোলে আইভরিকোস্টকে সমতায় ফেরান বদলি নামা আমাদ দিয়ালো। তবে সেই সমতা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি আফ্রিকার দেশটি। পরে ম্যাচের ৮৬ মিনিটে নরওয়ের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন ‘গোলমেশিন’ হালান্দ। বিশ্বকাপে হলান্ডের করা ৫ম গোলই নরওয়েকে পৌঁছে দিয়েছে শেষ ষোলোয়। আগামী ৬ জুলাই শেষ ১৬Ñএর ম্যাচের পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে নরওয়ে।
ফর্মের তুঙ্গে বললেও যেন কম বলা হয়ে যাবে। নরওয়ের আর্লিং হালান্দ আছেন বৃহস্পতি তুঙ্গে, যা ছুঁয়ে দেখছেন, তাই যেন সোনা হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে চার গোল করে দলকে তুলেছিলেন নকআউট পর্বে। তাইতো ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে তাকে বিশ্রাম দেন কোচ। আগের ম্যাচের বিশ্রাম পাওয়া হালান্দকে ডালাসে কাল শুরু থেকে সেভাবে দেখা যায়নি। তাকে ভালো ভাবেই মার্ক করেছিলেন আইভরি কোস্টের ডিফেন্ডাররা। প্রথমার্ধে নরওয়ের চেয়ে আক্রমনও বেশি করেছে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্ব জায়গা করে নেয়া আইভরি কোস্ট। ছোট ছোট পাসে তারা নরওয়ের রক্ষণভাগকে বেশ চাপেও ফেলেছিল আফ্রিকার দেশটি। তবে ৩৯ মিনিটে খেলার ধারার বিপরীতে লিড পায় নরওয়ে। গোলটি করেন ছোটবেলা থেকেই নেইমার জুনিয়রকে অনুসরণ করেন আন্তোনিও নুসা। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৩৯ মিনিটে বক্সের ভেতর ঢুকে বাঁ পাশ থেকে বাঁকানো শটে আইভরি কোস্টের জাল কাঁপান নুসা। গোল উদযাপনও করেন নেইমারের মতো করে। এর কিছুক্ষণ পরেই ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন হালান্দ। কিন্তু গোললাইন থেকে ইব্রাহিম সাঙ্গারের অবিশ্বাস্য এক ব্লক আইভরি কোস্টকে ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে দেয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফিরতে মরিয়া আইভরি কোস্ট কোচ বড় পরিবর্তন আনেন। ৬০ মিনিটে বনি ও উলাইকে তুলে তিনি মাঠে নামান আমাদ দিয়ালো এবং এলি ওয়াহিকে। একৌশলগত চালটি ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়। মাঠে নেমেই দিয়ালো প্রথমে ৬৬ মিনিটে নরওয়ের হেগেমের একটি নিশ্চিত গোলের শট লাইন থেকে ক্লিয়ার করেন। ৭৪ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে নিকোলাস পেপের সঙ্গে চমৎকার ওয়ান-টুর পর বক্সে ঢুকে কোনাকুনি শটে আইভরি কোস্টকে সমতায় ফেরান দিয়ালো নিজেই। খেলা যখন ১-১ সমতায় থেকে অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের মূল চরিত্রে হাজির হলেন হালান্দ। পুরো ম্যাচে আইভরি কোস্টের ডিফেন্ডাররা তাকে কড়া পাহারায় আটকে রাখলেও ৮৬ মিনিটে তিনি আর ভুল করেননি। ওসকার ববের পাস থেকে যখন প্যাট্রিক বার্গ বক্সে নিচু ক্রস বাড়ালেন, সেখানে ওত পেতে থাকা হালান্দ আলতো টোকায় বল জালে পাঠিয়ে নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। নরওয়ের জার্সিতে নিজের খেলা শেষ ১৩ ম্যাচের প্রতিটিতেই তিনি গোল করলেন, আর এই সময়ে প্রতিপক্ষের জালে বল ফেলেছেন ২৫ বার। চলতি বিশ্বকাপে এটি তাঁর পঞ্চম গোল। তবে নাটকের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি ছিল। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে বক্সের বেশ বাইরে থেকে নেওয়া দিয়ালোর ফ্রি কিক গোলপোস্টের কোণ দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। কিন্তু গোলরক্ষক নেলান্দ বাজপাখির মতো লাফিয়ে উঠে বলটি বাইরে ঠেলে দেন। তাতে নরওয়েও হাফ ছেড়ে বাঁচে। এই রোমাঞ্চকর জয়ে রোববার নিউজার্সিতে বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে তারা। যেখানে জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট আগেই কেটে রেখেছে ব্রাজিল।
