জুলাই সনদ ও গণভোট বিতর্ক: অভ্যুত্থান-পরবর্তী রূপান্তর

জুলাই সনদ ও গণভোট বিতর্ক: অভ্যুত্থান-পরবর্তী রূপান্তর

ফন্ট সাইজ:

এক: বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক-সাংবিধানিক পরিসরে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’’ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত গণভোট এবং ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সংস্কার-প্রক্রিয়া এক ব্যতিক্রমী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্ককে নিছক কোনো সংসদীয় বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী কৌশল, কিংবা দলীয় সমঝোতার সীমিত আলোচনায় আবদ্ধ করা যাবে না। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিন্যাস, সাংবিধানিক বৈধতা, জনগণের সার্বভৌমত্ব, এবং রূপান্তরকালীন শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে শূন্যতা, অনিশ্চয়তা, এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তারই ধারাবাহিকতায় জুলাই সনদের প্রশ্নটি সামনে আসে। ফলে এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন- একটি বিপর্যস্ত বা ট্রানজিশনাল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কীভাবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় এবং সেই ধারাবাহিকতার সীমারেখাই বা কোথায়? এই আলোচনায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ১০৬ অনুচ্ছেদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা, রাষ্ট্রপতির আদেশ ও ক্ষমতার সীমা, রুশোর জনগণের ইচ্ছা-ধারণা, নোট অব ডিসেন্টে ও গণভোট বিতর্ক, জুলাই সনদের সীমারেখা ও ভবিষ্যৎ বাধ্যবাধকতা, ৮ম-১৩তম-পঞ্চদশ সংশোধনীর শিক্ষা এবং রাজনৈতিক কৌশল- এই বিষয়গুলোর পর্যালোচনার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।
বাংলাদেশে সাংবিধানিক বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে সংবিধান বহুবার সংশোধিত হয়েছে, বহুবার বিচারিক পর্যালোচনার মুখোমুখি হয়েছে এবং বহুবার রাজনৈতিক প্রয়োজন ও সাংবিধানিক নীতির মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু জুলাই সনদ-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিতর্কের বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল অতীতের কোনো সাংবিধানিক ধারার ব্যাখ্যা নয়; বরং এটি এক অন্তর্বর্তী ও অস্থায়ী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য একটি নতুন নর্ম বা মানদণ্ড নির্মাণের চেষ্টা। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির আদেশ, গণভোট, এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ- সবগুলোই সাংবিধানিক ক্ষমতার উৎস, ব্যবহার এবং সীমা সম্পর্কে পুনর্বিবেচনার দাবি তোলে। কাজেই বিষয়টিকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা অসম্ভব।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বহুমাত্রিকতা। একদিকে রয়েছে আইনি প্রশ্ন- রাষ্ট্রপতির এমন একটি আদেশ জারির ক্ষমতা আছে কিনা, যা সংবিধানের প্রচলিত কাঠামোতে সরাসরি উল্লিখিত নয়। অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্ন- একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে গঠিত কমিশন বা উপদেষ্টা পরিষদ কি এমন সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবকে প্রক্রিয়াগত বৈধতা দিতে পারে। তৃতীয়ত, রয়েছে দার্শনিক প্রশ্ন- জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায় কীভাবে প্রকাশ পাবে এবং সেই অভিপ্রায় প্রকাশের পদ্ধতি কি লিখিত সংবিধানের সীমা অতিক্রম করতে পারে। এই তিনটি স্তর একত্রে বিবেচনা না করলে “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’’ ও জুলাই সনদ নিয়ে যেকোনো বিশ্লেষণ খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই আজকের আলোচনার উদ্দেশ্য কেবল রাষ্ট্রপতির আদেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে নয়; বরং এই আদেশের পেছনে যে রূপান্তরকালীন রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক দরকষাকষি, এবং জনগণ-রাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন পাঠ নির্মিত হচ্ছে, সেটিকে বিশ্লেষণ করা।

সাম্প্রতিক আলোচনার একটি বড় দুর্বলতা হলো এর খণ্ডিত ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট চরিত্র। রাজনৈতিক দল, টকশো আলোচক, সংবাদপত্রের কলামিস্ট, এবং সংসদীয় বক্তারা প্রায়ই বিষয়টির একাংশকে সামনে এনে সমগ্র বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কেউ একে কেবল “সংবিধান মানা-না-মানা”র প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করছেন, কেউ আবার এটিকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। অথচ একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক রূপান্তর সাধারণত এত সরল নয়। বিশেষত যখন একটি দীর্ঘকালীন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার শূন্যতা তৈরি হয়, তখন আইনি স্বাভাবিকতা এবং রাজনৈতিক ব্যতিক্রমী অবস্থা একে অপরের সঙ্গে কন্ট্রাডিক্ট করে অথবা একটা মধ্যবর্তী অবস্থা তৈরি করে। এ রকম পরিস্থিতিতে আইন কখনও বিদ্যমান কাঠামো রক্ষা করে, আবার কখনও কাঠামোর বাইরের বাস্তবতাকে কৌশলগতভাবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের জুলাই সনদ বিতর্কও এই বোর্ডারলাইন অবস্থানের একটি উদাহরণ।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনে এ বিতর্কের ব্যবহারও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। বিরোধী পক্ষের একটি অংশ এটিকে সরকারকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করার হাতিয়ার বানাতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যৎ আন্দোলনে সরকারকে পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। সরকার পক্ষও এই বিতর্ককে পুরোপুরি উন্মুক্ত আলোচনার জায়গায় ছাড়তে আগ্রহী নয়; বরং তারা বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রিত ও কৌশলগতভাবে সামাল দিতে চাইছে। কারণ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে ওভার এক্সটেন্ডেড প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক অথবা প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, আবার আল্ট্রা ন্যারো অবস্থান জুলাই অভ্যুত্থানের জন আকাক্সক্ষার বিপরীতে চলে গেলে রাজনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে। এই দ্বৈত চাপের মধ্যে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষই নিজেদের সুবিধামতো অবস্থান নিতে চাচ্ছে। ফলে জনপরিসরে যে আলোচনা দেখা যাচ্ছে, তা অনেক সময় প্রকৃত আইনি বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থান-প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বেশি।
দুই:
এই সমগ্র প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা কি কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়, নাকি কোনো রূপান্তরকালীন গণ-সমর্থনের মাধ্যমেও তা সাংবিধানিক রূপ পেতে পারে? প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক রুশো তাঁর সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের বিখ্যাত বই “দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট” বা “সামাজিক চুক্তি” বইতে রাষ্ট্র, স্বাধীনতা এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। রুশোর “মবহবৎধষ রিষষ” ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু রুশোর জনগণের ইচ্ছা কখনওই অস্পষ্ট বা শ্যাটার্ড ছিল না; বরং তা ছিল একটি নৈতিক-রাজনৈতিক সামষ্টিক অভিপ্রায়, যা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রূপ লাভ করে। জুলাই সনদ-সংক্রান্ত বিতর্কে এই প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ এখানে জনগণের নাম ব্যবহার করে একাধিক ভিন্নধর্মী সাংবিধানিক বিষয় একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে গণভোটের প্রকৃত অর্থ, এর প্রশ্নের সুনির্দিষ্টতা এবং এর ফলাফলের বাধ্যবাধকতা-এসব বিষয় এখানে বিবেচনার দাবি রাখে ।
তদুপরি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংস্কার ও স্থিতিশীলতার মধ্যে এক দীর্ঘকালীন টানাপোড়েন রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা হলো- যখনই রাষ্ট্র বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চেয়েছে, তখনই একদিকে সরকার ও বিরোধী পক্ষের রাজনীতিকেন্দ্রিক স্বার্থ, অন্যদিকে জনগণের তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা, এবং তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা—এই তিনটি বিষয় সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নেও একই ধারা দৃশ্যমান। একপক্ষ বলছেন, এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ; আরেকপক্ষ বলছেন, এটি সংবিধান ও নির্বাচিত সংসদের ক্ষমতা খর্ব করার কৌশল। বাস্তবে সম্ভবত দুই দাবিই আংশিক সত্য। কারণ রূপান্তরকালীন রাষ্ট্রে একসঙ্গে বৈধতা, স্থিতিশীলতা, এবং সংস্কার- এই তিনটি একসঙ্গে সর্বদা অর্জন করা যায় না। ফলে রাষ্ট্রকে কখনও পর্যায়ক্রমিক সমাধান, কখনও আপস এবং কখনও অস্থায়ী সাংবিধানিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হয়। তাই জুলাই সনদ ও গণভোটকে একটি বিচ্ছিন্ন দলিল হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে রূপান্তর, ব্যতিক্রম, এবং পুনর্গঠন- এই তিনটি ধারার সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করাটা শ্রেয় বলে মনে করছি ।
আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো, ক) রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে গণভোটের প্রক্রিয়াগত ও সাংবিধানিক ন্যায্যতা, খ) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, গ) ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর আরোপিত বাধ্যবাধকতার সীমা এবং ঘ) জনগণের অভিপ্রায়ের রাজনৈতিক-দার্শনিক তাৎপর্য- এসবকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা যে, বাংলাদেশের সাংবিধান ও গণ অভ্যুত্থান এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশের পথচলাকে মসৃণ করা।
এই পথচলা নিয়ে শুধু সাংসদ বা আইনজ্ঞদের নয়, রাষ্ট্রচিন্তক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, এবং গণতন্ত্র-চিন্তকদেরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
তিন:
আমরা সকলেই জানি যে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার মধ্যে এক জটিল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫”, রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই বিতর্কে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক সীমা, ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন ও গণভোটের সাংবিধানিক অবস্থান এবং রুশোর মবহবৎধষ রিষষ বা জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা যেতে পারে । আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনে জনরায়কে বিবেচনায় রেখে জুলাই সনদ তথা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নে সমন্বিত পদ্ধতি নির্মোহভাবে নিরূপণ করা।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক বিতর্ক নিছক প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের রূপান্তর, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর পূর্ববর্তী ক্ষমতাকাঠামোর পতনে যে রাজনৈতিক শূন্যতা, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং সংবিধাননির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় সংকট সৃষ্টি হয়, সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রণীত সমন্বিত “জুলাই সনদ” একদিকে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রতিফলন, অন্যদিকে একপাক্ষিক রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির উদ্যোগ সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক অনৈক্য সৃষ্টির বীজ রোপন করে। বিশেষ করে, ঐকমত্যের বাইরে থাকা কিছু বিধানকে গণভোটের মাধ্যমে যুক্ত করার প্রচেষ্টা যেমন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তেমনি এর প্রক্রিয়াগত বৈধতা সম্পর্কেও সংশয় তৈরি করেছে। জনগণের অভিপ্রায় যদি পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হয়, তবে সেই পরিবর্তন কোন পদ্ধতিতে, কোন সাংবিধানিক ক্ষমতার আওতায় এবং কোন আইনি বৈধতায় কার্যকর হবে—এই প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না। একই সঙ্গে, অভ্যুত্থানকে যদি জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে ধরা হয়, তবে অভ্যুত্থানপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজনমূলক ইস্যু রেখে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কি সত্যিই কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান, নাকি তা কেবল ইস্যু জিইয়ে রেখে সুবিধা আদায় এবং বহিঃশক্তির সামনে দুর্বলতা বাড়ানোরই আরেকটি উপায়, সেই প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচ্য।
আরও একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে এই কারণে যে, সনদের অনেক প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ও ভিন্নমত একই কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপিত হয়েছে। গণভোটের প্রশ্নও এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যে, ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার এবং বিতর্কিত প্রস্তাব—দুটিকে একত্রে একই প্যাকেজে রাখা হয়েছে। ফলে ভোটার প্রকৃতপক্ষে কোন অংশে সম্মতি বা অসম্মতি জানাচ্ছেন, তা স্পষ্টভাবে নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অতীতের বিতর্কিত পদক্ষেপকে প্রিসিডেন্স হিসেবে গ্রহণ করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করাও যৌক্তিক নয়। তাই মূল প্রশ্ন হলো, সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে থেকে, রাজনৈতিক স্কোরিংয়ের চিন্তা এড়িয়ে, জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই পরিবর্তন ও রূপান্তরকে কীভাবে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সন্নিবেশিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।
চার:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জরুরি রূপান্তর, সংবিধান-পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলে সংবিধানের যথেচ্ছ ব্যবহার নতুন নয়। এছাড়া সংবিধানের লিখনিতে দেশের জনআকাঙ্খার ঘাটতি বা পাশ কাটানো নিয়েও সমালোচনা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ (কোনো ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের এমনকি শপথ ব্যতিত আদেশ জারি), ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফর) এর অধীনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন এবং পরবর্তীতে নির্বাচনোত্তর নতুন সংবিধানের অনুমোদন রাষ্ট্র-গঠনের একটি ব্যতিক্রমী সময়কে নির্দেশ করে। কিন্তু যতই বলিনা কেন, ২০২৪ সালের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে প্রশ্ন ছিল না নতুন রাষ্ট্র গঠন, বরং গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন আর সংবিধানভিত্তিক সংস্কার- দুইটি এক জিনিস নয়।
৫ই আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তখন কার্যত অকার্যকর ছিল তাও অস্বীকার করা যাবে না। শাসকগোষ্ঠীর দেশত্যাগ, সংসদের বিলুপ্তি এবং প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা রাষ্ট্রকে এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়, যেখানে জরুরি রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন ছিল। এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো গ্রহণ করা হয় এবং পরে রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু করে। তাই জুলাই সনদকে কেবল সংবিধান সংস্কারের দলিল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। যেখানে সমঝোতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কারো উপর কিছু চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা বা একে অন্যের উপর রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করা বা ফায়দা হাসিলের চিন্তা করা হবে অনৈতিক কাজ ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের কাছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রশ্নে পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ আছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রশ্নে এই অনুচ্ছেদের সহায়তা নেয়া হয়, যা সাংবিধানিক শূন্যতা এড়ানোর একটি পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ১০৬ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা একটি উপদেশমূলক কাঠামো; এটি সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করে না। অর্থাৎ, আদালতের মতামত দ্বারা রাজনৈতিক বৈধতার সমস্যা আংশিক সমাধান হতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক ক্ষমতার উৎস সম্পূর্ণ নতুনভাবে সৃষ্টি হয় না।
এই দিক থেকে দেখলে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভিত্তি ছিল ফ্যাসিস্টবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও দলসমূহের রাজনৈতিক-সাংবিধানিক একতার মেলবন্ধন। সেই মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। তখন কিন্তু সংবিধান স্থগিত করে বা পাশ কাটিয়ে অন্য পথ অবলম্বন করা হতো, হয়তো তা সম্ভব হতে পারতো। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু ঘটেনি- নেসেসিটি সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল পর্যায়ে ৩রা আগস্ট শহীদ মিনারে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল শেখ হাসিনাকে প্রধান রেখে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছিলেন যা এখনো অনলাইনে পাওয়া যায়। ৫ই আগস্ট সেনাকুঞ্জের আলোচনা থেকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ সাক্ষাতের মধ্যে সবাই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পথ খুঁজছিলেন। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মুহূর্তেও সংবিধানকে উপেক্ষা করার কোনো প্রচেষ্টা হয়নি—বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীরের একটি বক্তব্য থেকেও এর প্রমান পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন না থাকলে বা সংসদ ভেঙে গেলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু এটি সাধারণ আইন প্রণয়নের একটি অস্থায়ী পদ্ধতি; এটি সংবিধান সংশোধন বা সাংবিধানিক শূন্যস্থানে নতুন স্থায়ী ক্ষমতা সৃষ্টির পথ নয়। আবার সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে যে ক্রান্তিকালীন আদেশ-ক্ষমতা ছিল, তা প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকের মাধ্যমে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির “আদেশ” জারির ক্ষমতা কতটা বৈধ, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও তিনি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হন এবং সংবিধান অনুযায়ী শপথ গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর ক্ষমতা লিখিত সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ। যদি কোনো আদেশ সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে জারি হয়, তাহলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এখানে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয় বরং সাংবিধানিক অনুমোদনই নির্ণায়ক। সুতরাং “জনগণের পরম অভিপ্রায়”-এর উল্লেখ থাকলেই কোনো আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবিধানিক বৈধতা পেয়ে যায় না। এছাড়া এই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি যদি এমন কোনো আদেশ জারি করেন, যা সংবিধানের সাধারণ কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি মেলে না, তাহলে বৈধতার প্রশ্ন আবার সামনে চলে আসে। “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ” এই শ্রেণির মধ্যেই পড়ে।

রুশোর রাজনৈতিক দর্শনে জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা বা মবহবৎধষ রিষষ রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। এই ধারণা অনুযায়ী, জনগণ যখন একটি কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেয়, তখন সেই কর্তৃত্ব বৈধতার ভিত্তি পায়। কিন্তু রুশো কখনও বলেননি যে, জনগণের ইচ্ছা প্রক্রিয়াহীন বা অস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতে পারে। বরং জনগণের ইচ্ছাকে পরিষ্কার, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত হতে হবে। এখানেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি জনগণের ইচ্ছা গণভোটের মাধ্যমে যাচাই করা হয়, তাহলে প্রশ্ন হতে হবে নির্দিষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, এবং একক ইস্যু-ভিত্তিক। কিন্তু একাধিক ভিন্নধর্মী বিষয় একই প্রশ্নে জুড়ে দিলে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা কী, তা অস্পষ্ট থেকে যায়।
এই কারণে ‘রিষষ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব’ যুক্তিটি রাজনৈতিক বৈধতা দিতে সক্ষম হলেও, এটি সাংবিধানিক নির্ভুলতার বিকল্প হতে পারে না। জনগণের অভিপ্রায় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই অভিপ্রায়কে সাংবিধানিক ভাষায় অনুবাদ করতে হবে সুস্পষ্ট, পরিমিত, এবং প্রক্রিয়াগতভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে।

পাঁচ:
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে স্থায়ী গণভোট-ব্যবস্থা নেই। অতীতের কিছু সাংবিধানিক বিতর্কে গণভোটের প্রসঙ্গ থাকলেও, বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে তা স্বয়ংক্রিয় ও সাধারণ প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের আয়োজন করতে হলে, প্রথমেই এর সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট করতে হবে। গণভোটকে কি সংবিধান-সংশোধনের পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রতীকী মাধ্যম হিসেবে? এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না হলে গণভোটের ফলাফল ভবিষ্যতে সাংবিধানিক বিতর্ক তথা নতুন বিরোধের জন্ম দিতে পারে।
আরও একটি সমস্যা হলো প্রশ্নের বিন্যাস। গণভোটের প্রশ্নে একদিকে নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; অন্যদিকে উচ্চকক্ষ, পিআর পদ্ধতি সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার- এসব একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই “সব কিছু এক প্রশ্নে” পদ্ধতি জনগণের খণ্ডিত মতামতকে একত্র করে একক হ্যাঁ/না-তে রূপান্তরিত করছে। গণতন্ত্রে এটি সমস্যা সৃষ্টি করে, কারণ একজন ভোটার হয়তো এক বিষয়ে সম্মত কিন্তু অন্য বিষয়ে অসম্মত। তখন তাঁর ভোটের অর্থ কী দাঁড়ায়?
জুলাই সনদের আলোচনায় কিছু দল স্পষ্টভাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি কিছু বিষয়ে ভিন্নমত রেখেছে—যেমন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, উচ্চকক্ষের পিআর পদ্ধতি, এবং কিছু ক্ষমতা-বণ্টন সম্পর্কিত বিষয়। কিন্তু একই সনদে এসব ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও যদি “ঐকমত্য” শব্দটি ব্যবহার করে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা নীতিগতভাবে বিভ্রান্তিকর। কারণ ঐকমত্য মানে সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্যতা নয়; বরং নির্দিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম সম্মতি। নোট অব ডিসেন্টকে উপেক্ষা করে ঐকমত্যের ভাষ্য তৈরি করার কারণে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই সনদের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর বর্তমান রাজনৈতিক সমঝোতার বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রবণতা এবং আদালতে চ্যালেঞ্জ না করার ঘোষণা। একটি পরবর্তী সংসদকে “অবশ্যই” একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো সংস্কার পাস করতে হবে, অথবা না করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়ে যাবে- এ ধরনের ধারণা সংবিধান-দর্শনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোনো বর্তমান রাজনৈতিক কমিশন বা অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে ভবিষ্যৎ সংসদকে বাধ্য করা সাধারণভাবে সম্ভব নয়। লিখিত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের মর্মই হলো, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত থাকা।
অতএব, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব- বিশেষত ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার না হলে অটো পাসের ধারণা সাংবিধানিক ও ন্যায়তাত্ত্বিক উভয় দিক থেকেই ছিল দুর্বল। পরবর্তী সংস্করণে ১৮০ দিনের সময়সীমা দিয়ে অটো পাশের বিধান তুলে দেয়া হলেও মৌলিক সমস্যা থেকে যায়। কারণ ভবিষ্যৎ সংসদকে আইনত বেঁধে দেয়ার কোনো সাধারণ সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায় । তবে ঐক্যমতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হলে, আলাদা কথা; এক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ সিদ্বান্তটি বাস্তবায়নে নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরী হয়, কিন্তু যদি তা বাধ্যতামূলক আইনগত দাবি হয়, তবে তা বিতর্কিত। তাই রাজনৈতিক ঐক্যমত ব্যতিরেকে জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন নৈতিক ও আইনি মানদন্ডে উত্তীর্ণ করা দুস্কর।

বাংলাদেশের সংবিধানের বিচারিক ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, সব সংশোধনী আদালতের কাছে সমানভাবে বৈধ নয়। অষ্টম সংশোধনী (১৯৮৮) হাইকোর্ট বিভাগের এককত্ব লঙ্ঘন করে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে; ত্রয়োদশ সংশোধনী (১৯৯৬) তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তনে মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল হয়েছে; এবং পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১) সাংবিধানিক ও সংসদীয় সার্বভৌমত্ব এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করে মৌলিক কাঠামো ধ্বংসকারী ঘোষিত হয়েছে। এই ঘটনাসমূহ জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ ও জুলাই সনদের জন্য সতর্কবার্তা: যদি কোনো প্রস্তাব মৌলিক কাঠামোর (যেমন সংসদীয় সার্বভৌমত্ব, বিচারিক স্বাধীনতা) সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে রাজনৈতিক সমর্থন সত্ত্বেও বিচারিক পর্যালোচনায় তা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো ধরণের রাজনৈতিক স্কোরিংয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কারই একমাত্র পথ। গণঅভ্যুত্থান যেমন জনআকাঙ্খাকে ধারণ করে ঠিক তেমনি গণঅভ্যূত্থানের পূর্বে এর সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একটা সুস্পষ্ট পথরেখা থাকাটা বাঞ্চনীয়। গণভোটে বিপরীতধর্মী প্রশ্নের একই উত্তর নেয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাকে এড়িয়ে যাওয়াও প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে গণভোটের ফলাফল যেমন জনআকাক্সক্ষা প্রতিফলন ঠিক তেমনি সরকার দলীয় নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোও জনআকাক্সক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনও বিপরীতধর্মী অবস্থান সুস্পষ্ট। আর এজন্য জনগণ দায়ী নয়, বরং জনগণের কাছে স্পষ্ট উপস্থাপনার দুর্বলতা দায়ী।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে; ক্ষমতাসীনরা সাংবিধানিক কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে, বিরোধীরা সরকারকে সংস্কারবিরোধী প্রতিপন্ন করতে ব্যস্ত এবং অন্যান্য দলগুলো দুই মেরুর যেকোনো একদিকে অবস্থান করছে। ফলে নীতিগত আলোচনা প্রায়ই ক্ষমতা-দর কষাকষিতে পরিণত হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে এমনটি অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সংকটকালে আইনি বিশ্লেষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কারণ এটিই রাজনৈতিক আবেগের মধ্যে শৃঙ্খলা আনে। রাষ্ট্রপতির আদেশের দুর্বলতা এবং ঐকমত্যের বাইরে বিপরীতধর্মী প্রস্তাব গণভোটে যুক্ত করায় ভবিষ্যতে বিচারিক বাতিলের ঝুঁকি বেড়েছে। সুতরাং, আইনপ্রণেতা, রাজনৈতিক দল এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের উচিত ছিল এমন একটি ধাপে ধাপে কাঠামো গ্রহণ করা, যা বিচারিক, রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে টেকসই হয়। সবকিছু একসঙ্গে চাপিয়ে দিলে তিক্ততা বাড়তে বাধ্য। হয়তো এখান থেকে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন সম্ভব, তবে এই সংকট থেকে উত্তরণ এবং ভবিষ্যৎ পথ সুগম করতে সকলের সমন্বয় ও আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

উপসংহার:
জুলাই সনদ, রাষ্ট্রপতির আদেশ, এবং একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একদিকে এটি ২০২৪-পরবর্তী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রচেষ্টা; অন্যদিকে এটি বিদ্যমান সংবিধানের সীমা ও ক্ষমতার প্রশ্নকে তীব্র করেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের সাধারণ অধ্যাদেশ ক্ষমতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে কি না, তা সন্দেহজনক। গণভোটের প্রশ্নের বিন্যাসও স্পষ্ট ও পৃথক ইস্যুভিত্তিক নয়; ফলে ভোটারের প্রকৃত সম্মতি নির্ণয় কঠিন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর বর্তমান সমঝোতার বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রয়াস সংবিধান-দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে এটিও সত্য যে, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে অচল হতে দেয়া সম্ভব ছিল না। সেই অর্থে জুলাই সনদ ও গণভোট একটি রাজনৈতিক প্রয়োজনের ফল। তাই এটিকে নিছক অবৈধ বলাও যথেষ্ট নয়; বরং একে একটি ব্যতিক্রমী রূপান্তরকালীন বন্দোবস্ত হিসেবে দেখতে হবে, যার বৈধতা রাজনৈতিক সমর্থন, বিচারিক পর্যালোচনা, এবং ভবিষ্যৎ সংসদীয় অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে গণভোটকে ফ্যাক্টাম ভ্যালেট (ঘটনাক্রমে সিদ্ধ) হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারের কথা পুনরুল্লেখ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে একই কথা বলেছেন। তাই সকল পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সংসদে ও সংসদের বাইরে একটা সমঝোতার পথ বের করা হবে উত্তম। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জনগণের ইচ্ছা অবশ্যই রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে থাকতে হবে, কিন্তু সেই ইচ্ছাকে সাংবিধানিক ভাষায় রূপ দিতে হবে স্বচ্ছ, নির্দিষ্ট এবং পদ্ধতিগতভাবে শুদ্ধ উপায়ে। নচেৎ রাজনৈতিক সমাধান সাময়িক স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা নতুন সাংবিধানিক বিরোধের জন্ম দেবে।

লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক, সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

BAD MOUTH

১ মাস আগে

নতুন সংবিধানই সমাধানের একমাত্র পথ। সমস্যা ডিজিটাল, এনালগ দিয়ে সমাধান হবেনা l

মন্তব্য করুন