রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোথায়?

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোথায়?

ফন্ট সাইজ:

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও কার্যকর সমাধান রাখাইন রাজ্যেই নিহিত বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। শনিবার (১৮ এপ্রিল) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে তুরস্কে চলমান আনতালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য প্রদানকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য কূটনৈতিকভাবে যথার্থ হলেও বর্তমান বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল, বহুস্তরীয় এবং অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ।

কারণ একদা আরাকান বা আজকের রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গা বা আরাকানিদের জন্মভূমি ও আদিমাটি হলেও বর্তমানে প্রদেশটি কেবল মাত্র মিয়ানমারের একটি প্রদেশ নয়, এটি পরিণত হয়েছে এক বহুমাত্রিক জাতিগত সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে, যেখানে রাষ্ট্র, অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও কার্যকর সমাধান রাখাইন রাজ্যেই নিহিত, কথাটি সত্য হলেও এর সঙ্গে আরও বহু কিছু জড়িত। বিশেষত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কবে হবে, কোন বাস্তবতায় হবে, কাদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে হবে, কী শর্তে এবং কতটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে, তা-ও ভাবতে হবে বাংলাদেশকে।

উল্লেখ্য, রাখাইনের বাস্তবতা আসলে রাষ্ট্র বনাম অরাষ্ট্রীয় শক্তির দ্বৈত সংকটের বিষয়। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা বিদ্রোহী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এমনকি, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আরাকান আর্মি কর্তৃক অধিকৃত অঞ্চল থেকে তাদের অত্যাচারের কারণে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসছে কিংবা মিয়ানমার ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের বদলে আরো নিষ্ঠুর আচরণ করছে বলেও গত সপ্তাহে কক্সবাজারে সরজমিনে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে।

আরাকান বা রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মির কর্তৃত্ব শুধু একটি সামরিক অগ্রগতি নয়। বরং একটি বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তাদের রাজনৈতিক শাখা ইউরাইটেড লীগ অব আরাকান কার্যত একটি সমান্তরাল প্রশাসন পরিচালনা করছে—যেখানে আদালত, পুলিশ, ট্যাক্স ব্যবস্থা—সবই বিদ্যমান। তাছাড়া, আরাকান আর্মিও মিয়ানমান সরকারের মতোই রোহিঙ্গা বিরোধী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে।

অন্যদিকে, মিয়ানমার সরকারি বাহিনী এখনো সিতওয়ে ও চকপিউয়ের মতো কৌশলগত বন্দরগুলো ধরে রেখেছে, যা চীনসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামো রাখাইনে একটি বিভাজিক সার্বভৌমত্ব তৈরি করেছে, যেখানে কোনো একক কর্তৃপক্ষের অধীনে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা প্রায়-অসম্ভব।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন এখন আর শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং অরাষ্ট্রীয় শক্তি ও অন্যান্য জাতিগত বিদ্রোহ গ্রুপগুলোও একই ধরনের হিংসাত্মক আচরণ করছে। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য পুরো মিয়ানমার এবং তাদের প্রদেশ রাখাইন বিপজ্জনক। দেশটির প্রায়-সকল জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গা বিদ্বেষী। ফলে রোহিঙ্গাদের “নিরাপদ প্রত্যাবাসন” ধারণাটি বাস্তবে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বরং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তিনটি মৌলিক সংকট বা প্রতিবন্ধকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এবং বাংলাদেশের সামনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তিনটি কাঠামোগত বাধা উপস্থিত হয়েছে।

প্রথমত, নিরাপত্তার নিশ্চয়তাহীনতার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে সবাইকে। যখন রাখাইনে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে এবং আকাশ ও নৌ হামলা চলছে, তখন কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেই সেখানে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্ব ও অধিকার সংকট না মিটিয়ে প্রত্যাবাসন কতটুকু সফল হবে, সেটাও ভেবে দেখার মতো বিষয়। রোহিঙ্গাদের মূল সংকট তাদের রাষ্ট্রহীনতা। তাদের দাবি নাগরিক অধিকার। বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন-১৯৮২ এখনও কার্যকর থাকায় স্বদেশে রোহিঙ্গাদের াষ্ট্রীয় ও নাগরিক অধিকার পাওয়ার পথ রুদ্ধ। ফলে নাগরিকত্বে বিষয়টিকে চেপে রেখে প্রত্যাবাসন মানে হবে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন-নাগরিক পরিচয়ে পুনর্বাসন”—যা টেকসই নয় এবং রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারবে না।

তৃতীয়ত, সমস্যার সমাধানে গ্রহণযোগ্য কর্তৃপক্ষের অভাব দেখা দেওয়ায় রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কে দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্যতা রাখে, তা স্পষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো—রোহিঙ্গারা কার অধীনে ফিরে যাবে? মিয়ানমার সরকার, নাকি আরাকান আর্মি? উভয় পক্ষের প্রতিই তাদের অবিশ্বাস রয়েছে। আবার উভয় পক্ষই চরম ভাবে রোহিঙ্গা বিরোধী।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ কী করবে, তা আসলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে, বাংলাদেশকে যে একটি কৌশলগত বিকল্পের বাস্তব পরিকল্পনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া দরকার, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার জটিল বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একক কোনো সমাধান নেই। বরং প্রয়োজন বহুমাত্রিক, ধাপে ধাপে অগ্রসর একটি কৌশল গ্রহণ করা।

যেমন:
১. “মাল্টি-ট্র্যাক ডিপ্লোম্যাসি”: শুধু রাষ্ট্র নয়, অরাষ্ট্রীয় পক্ষের সাথেও সম্পৃক্ততা: বাংলাদেশ এতদিন প্রধানত মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আরাকান আর্মিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা কৌশলগত ভুল হবে। এখানে বহুমাত্রিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন—যেখানে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়েও মানবিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা চালানো যেতে পারে। কারণ বাস্তবে যাদের নিয়ন্ত্রণে ভূমি, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ছাড়া প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।

২. মানবিক সংকট থেকে নিরাপত্তা ইস্যুতে রূপান্তর: রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরলে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যায় (যেমন দাতা সহায়তা কমে যাওয়া)। তাই বাংলাদেশকে এটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে—জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ, আসিয়ান ভুক্ত দেশগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করা এবং ওআইসি‘কে সক্রিয় করা যেতে পারে। মূলত এই তিনটি স্তরে সমন্বিত কূটনীতি জরুরি।

৩. পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাবাসনের ধারণা: রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবাসন বিদ্যমান বাস্তবতায় এখন অবাস্তব। এর পরিবর্তে একটি পাইলট সেফ জোন মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে সীমিত এলাকায় পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুপাক্ষিক উপস্থিতি থাকবে এবং সেটা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা হবে। যদিও এটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন, কিন্তু বাস্তবতার সাথে সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সীমিত আকারে হলেও প্রত্যাবাসনের কাজ এগিয়ে নিতে সক্ষম।

৪. অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বা দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা স্বীকার: বাংলাদেশকে একটি কঠিন সত্য মেনে নিতে হবে—রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় দেশেই থাকবে বা তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে পারবে না। তাই প্রয়োজন—ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভারসাম্য। এটি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আত্তীকরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মধ্যে রাখার একটি অংশ অংশ।

৫. চীন-ভারত ফ্যাক্টর নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ: রাখাইনের সংঘাত ও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকরণ শুধু মানবিক সংকট নয়। এটি একটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র—চীন চকপিউ বন্দর ও যোগাযোগ সংযুক্তিকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে জড়িত। ভারত সিতওয়ে, কালাদান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে বাস্তববাদী কূটনীতি করতে হবে—যাতে তারা রাখাইনে স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানে ভূমিকা রাখে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নীতিগতভাবে সঠিক—সমাধান রাখাইনেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই রাখাইন কি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে, নাকি আরাকান আর্মির? এটি কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুজাতিক সমাজ হবে, নাকি নতুন এক জাতিগত আধিপত্যের কাঠামো? এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে।
বাংলাদেশের কৌশল তাই হতে হবে। বাংলাদেশকে নৈতিক অবস্থান (মানবাধিকার, প্রত্যাবাসন) এবং বাস্তব রাজনীতি (ক্ষমতার কাঠামো, সংঘাত, ভূরাজনীতি) ইত্যাদি ইস্যু একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোনো একক ঘটনার মাধ্যমে আসবে না। এটি হবে একটি দীর্ঘমেয়াদে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়া—যেখানে বাংলাদেশকে কেবল ভুক্তভোগী হয়ে বসে থাকলে চলবে না। বরং একটি সক্রিয়, কৌশলী এবং দূরদর্শী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে রোহিঙ্গা সংকট থেকে নিজেকে কৌশলে সরিয়ে আনতে হবে।


লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)

Abu Yusuf Harun

১ মাস আগে

Apparently, there is no quick solution to this massive crisis. Bangladesh, from the very beginning, could not play what was needed to play on time. Our neighbour did the correct role from their standing. Therefore, it has no problem. The then PM advised she could feed them as she was feeding the whole nation.
The way BD is doing its business with the crises, it would take more than 100 years to come to an end.

মন্তব্য করুন