সাধারণ মানুষের প্রোটিনের শেষ আশ্রয়স্থল ডিম ও ব্রয়লার মুরগি এখন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কায়। ফিডের আকাশচুম্বী দাম, অস্বাভাবিক করের বোঝাসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের এই পোল্ট্রি শিল্প এখন খাদের কিনারে। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি বিক্রয়মূল্য। ফলে নিঃস্ব হয়ে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন হাজার হাজার প্রান্তিক খামারি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তবে এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে বাজেটে দিতে হবে বিশেষ গুরুত্ব। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এ খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ ১০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১১ টাকা হলেও পাইকারি বাজারে অনেক সময় তা ৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে খামারি, বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন- প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রেখে শিল্পকে বাঁচাতে কর ও শুল্ক একেবারে নিম্নস্তরে নিয়ে আসতে হবে। নইলে দ্বিগুণ দামে কিনতে হতে পারে প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস ডিম, মুরগি, মাছ, মাংস। নাটোরের খামারি রাজ্জাক বলেন- খাদ্যের দাম এত বেড়েছে যে, গত ২০ বছরে এমনটি দেখিনি। কিন্তু আমাদের পণ্যের দাম না বাড়ায় প্রতিদিনই লোকসান দিচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাই না। এখন খাদ্যের দাম না কমলে খামার পরিচালনা করতে পারবো না। ফলে লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ শেষ হয়ে বেকার হয়ে যাবো। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন- পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রথমে খাদ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। কারণ খামারিদের মোট ব্যয়ের ৮০ শতাংশই হয় খাদ্য কেনায়। যেহেতু খাদ্য উৎপাদনের উপকরণগুলো আমদানিনির্ভর, তাই আমদানিতে আয়কর ও শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। অযৌক্তিক কর ও শুল্কের কারণে প্রান্তিক খামারিরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন- চোখের সামনে শত শত খামারিকে নিঃস্ব হতে দেখছি। তারা হারিয়ে গেলে পুরো শিল্পটি বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যাবে। তখন কোম্পানিগুলোর বেঁধে দেয়া দামেই ভোক্তাদের ডিম ও মুরগি কিনতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং ভোক্তাদের কাছে কম দামে ডিম, মুরগি, মাছ, মাংস পৌঁছে দিতে আয়কর, শুল্ক বর্তমানে যা আছে তার অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিকল্প নেই। পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন- এ খাতে সরকারকে কর ও শুল্কে নমনীয় হতে হবে। অন্তত টার্নওভার কর ০.২ শতাংশে নামিয়ে মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করা এবং করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশ ও এআইটি ১ শতাংশে করা জরুরি। ইতিমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের উদীয়মান এ শিল্পে। এ বিষয়ে তরুণ উদ্যোক্তা মো. সাফির রহমান বলেন- ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটে পরিবহনসহ সার্বিক খরচ ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে এবং ডিম-মুরগি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজেটে অবশ্যই সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন- এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এখন হুমকির মুখে। আসন্ন বাজেটে করের বোঝা কমিয়ে অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনা না হলে ডিম-মুরগি কেবল ধনীদের খাবারে পরিণত হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে রক্ষা করতে বিদ্যুতে ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
করপোরেট দখলে যাওয়ার শঙ্কায় অস্তিত্ব সংকটে পোল্ট্রি শিল্প
স্টাফ রিপোর্টার
৯ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
