চট্টগ্রাম ভার্সিটি: দুর্নীতি-অনিয়মের দায় কেন মেনে নেবে এই সরকার?

তাৎক্ষণিক মন্তব্য

চট্টগ্রাম ভার্সিটি: দুর্নীতি-অনিয়মের দায় কেন মেনে নেবে এই সরকার?

ফন্ট সাইজ:

আগের আমলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এন্তার তথ্য-প্রমাণ, অভিযোগ নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ হবে। তারপর সেটাকে চেপে রেখে বা দায়মুক্তি দিয়ে পরবর্তী সরকার একই দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। এটাই বাংলাদেশের এ যাবতকালের প্রচলিত রেওয়াজ, যাতে বিচার ও শাস্তির দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া না যায়। তাহলে দায়মুক্তির অতীত সংস্কৃতি মেনে নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের রাস্তা খোলা রাখবে বর্তমান সরকার? নাকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেবে?

দৃষ্টান্তস্বরূপ চট্টগ্রাম ভার্সিটির (চবি) কথা উল্লেখ করা যায়। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সমকাল লিড নিউজ করেছে ‘এক উপাচার্যের ৫৪৭ দিনে ৪২৫ নিয়োগ- শিরোনামে। এতে দেখা যায়, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক নিয়োগ পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ৫৪৭ দিন উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্তাব্যক্তি ৪২৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেকর্ড গড়েছেন। তার আমলে পাঁচটি সিন্ডিকেট বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয় এসব নিয়োগ। প্রতিটি সিন্ডিকেট গড়ে ৮৫ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৬০ বছরে দায়িত্ব পালন করা অন্য ২০ উপাচার্যের কেউই অল্প সময়ে এত বেশি সংখ্যক নিয়োগ দেননি। জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উপাচার্য ভেঙেছেন প্রথাও। সিন্ডিকেটের বৈঠক ডেকেছেন শুক্রবার। সর্বশেষ বৈঠক করেছেন তিনি একুশে ফেব্রুয়ারির মতো জাতীয় বন্ধের দিনেও।

নিয়োগে তার এতো আগ্রহের কারণ খুঁজে পেয়েছে গণমাধ্যম। তাদের ভাষ্য মতে, নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পছন্দের লোক দিয়ে নিয়োগ বোর্ড সাজিয়ে এক উপ-উপাচার্যের মেয়ে, আরেক উপ-উপাচার্যের গবেষণা সহযোগী ও শ্যালিকা, রেজিস্ট্রারের ভাই (একদা দুর্নীতর দায়ে আটক), এক প্রভোস্টের স্ত্রী এবং আরেক প্রভোস্টের ছেলেকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলা বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি ‘শিক্ষক লাগবে না’ বলে সুপারিশ করার পরও তিনি একসঙ্গে সাতজন শিক্ষক নেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। আবার প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে ক্রিমিনোলজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে। রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে আওয়ামী আমলে দুর্নীতির মাধ্যমে পদের অতিরিক্ত নিয়োগ প্রাপ্ত ৬ জন শিক্ষকতে তিনি স্থায়ী করেছেন। উল্লেখ্য, একদা তিনি এই নিয়োগে ভিন্নমত পোষণ করেন এবং ‘রহস্যজনক‘ কারণে এদেরকেই সুবিধা দেন। এমনকি, বিভাগী সভাপতিকে অনুপস্থিত রেখে তিনি এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। তাছাড়া, পছন্দের লোক নিয়োগ দিতে কলা অনুষদে ফলাফলের গ্রেড কমিয়ে পরিবর্তন আনা হয় নীতিমালায়।
একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে একাধিকবার চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে অভিযান পরিচালনা করে। এতে নেতৃত্ব দেওয়া দুদক চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম বলেন, ‘আমরা কমিশন বরাবর রিপোর্ট জমা দিয়েছি।’তিনি নিয়োগে এতোটাই মনোযোগী ছিলেন যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার সূচিতে ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ স্লোগান, মুছে ফেলার সময় পাননি।
দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতার কারণে সাধারণ শিক্ষকরা তাকে একাধিক বার ধাওয়া দিয়েছে। তার কক্ষে উপস্থিত হয়ে তার দুর্নীতি ও অযোগ্যতা জন্য জবাবদিহি চেয়েছে। এতেও তিনি পদ না ছেড়ে নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতি রাতে দিনে অব্যাহত রাখেন তিনি। তার আমলে সমাবর্তন ও চাকসু নির্বাচনে কয়েক কোটি টাকা খরচের গড়মিল রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। এমনকি, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়াদী সঞ্চয় ভেঙে ইচ্ছেমতো খরচ করেছেন। এসব কারণে তিনিই সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র উপাচার্য, যিনি সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি গিয়ে বসে থাকেন এবং ক্যাম্পাসে উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করার নৈতিক সাহস ও স্বচ্ছতা দেখাতে পারেন নি।
উল্লেখ্য, দেশজুড়ে এখন আলোচিত খবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি। সদ্য-বিগত আমলের ‘ঐতিহ্যের’ ধারাবাহিকতা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, নিয়োগবাণিজ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘সোনার অক্ষরে’ জ্বলজ্বল করছে! বিতর্কিত নিয়োগের অভিযোগের মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাস আরও বেশি সমৃদ্ধ করার পথেই চলেন সদ্য বিগত হর্তাকর্তারা। যাঁদের মধ্যে একজন অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে ইতিমধ্যে দেশজুড়ে চরম সমালোচিত হন। বিতর্কিত নিয়োগের অভিযোগে উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর মেয়ের নামও। তারপরও কত দ্রুত কত বেশি নিয়োগ দেওয়া যায়, সেই প্রতিযোগিতায় পুরো আমল ব্যস্ত ছিলেন তারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সদ্য বিগত প্রশানকে ‘জামায়াতপন্থী প্রশাসন’ আখ্যা দিয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বলেছে, ‘তাদের নগ্ন স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ-জালিয়াতি মূলত সুপ্ত ফ্যাসিবাদী চরিত্রের এক কুৎসিত ট্রেলারমাত্র। এই স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের চাবিকাঠি কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ পেলে গোটা দেশকে স্বজনপ্রীতির অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করবে।’

এসব অভিযোগ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এর পাশাপাশি সহ-উপাচার্যের কন্যার নিয়োগসহ সব বিতর্কিত ও অবৈধ নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল, ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিয়োগ বোর্ড পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এবং বিভাগীয় সভাপতিদের আপত্তি, পরিকল্পনা কমিটির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দেওয়া সব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার ও স্বচ্ছ-ন্যায্য নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিতের দাবিও জানায় সরকারের ছাত্র সংগঠনটি।


শুধু চট্টগ্রামেই নয়, সদ্য বিগত আমলেও ও এর পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী আমলে জাহাঙ্গীরনগর, বেগম রোকেয়া, বরিশাল, কুমিল্লাসহ দেশের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির বন্যা বয়ে ছিল। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত ও বিচার না হলে সব বোঝা এসে পড়বে বর্তমান সরকারের মাথায়। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে দায়মুক্তির ধারার সরকারের নানা সংস্থাও ব্যক্তি অনিয়ম ও দুর্নীতিতে লিপ্ত হবে। যখন দুর্নীতি ও অনিয়ম বিচারের আওতার বাইরে থাকে, তখন সেটা আর থামানো যায় না, চলতেই থাকে।
তাই বর্তমান সরকারকে এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রসঙ্গত, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী সম্ভবত এখনো নকল ধরার এক ধরনের “হ্যাংওভার”-এর মধ্যে আছেন। নকল দমন নিঃসন্দেহে একটি জরুরি ও প্রয়োজনীয় কাজ—এতে তাৎক্ষণিক সাফল্য দেখা যায়। প্রশাসনিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করা যায় এবং জনমনে একটি ইতিবাচক বার্তা যায়। অতীতে প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে তিনি এই ক্ষেত্রে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—পূর্ণ মন্ত্রী হওয়ার পর তার দৃষ্টিভঙ্গি কি প্রসারিত হয়েছে, নাকি আগের সেই সীমিত ফোকাসেই আবদ্ধ রয়ে গেছে? আজ তার দায়িত্ব শুধু স্কুল-কলেজে নকল দমন নয়। বরং পুরো উচ্চশিক্ষা খাত—বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়—তার নীতিনির্ধারণী পরিসরের অন্তর্ভুক্ত। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয় খাতেই বিগত আমলে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে, তা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অনেক বেশি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করেছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি হলো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা—এটি নীতিনির্ধারণ, প্রশাসন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফল।
শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক আনুগত্য, পদোন্নতিতে অনিয়ম, গবেষণা অনুদানের অপব্যবহার, অবকাঠামো উন্নয়নে দুর্নীতি, প্রশাসনিক পদে দলীয়করণ—এসব কেবল বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এগুলো মিলে একটি দুর্নীতির কাঠামো তৈরি করেছে, যা জ্ঞান উৎপাদন, শিক্ষার মান এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
যদি শিক্ষামন্ত্রী তথা বর্তমান সরকার সত্যিই শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন চান, তবে নকলবিরোধী অভিযানের বাইরে এসে বিশ্ববিদ্যালয় খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমান—বরং আরও বেশি—কঠোর ও দৃশ্যমান অবস্থান নিতে হবে। নইলে নকল দমন হবে কেবল একটি প্রতীকী সাফল্য। আর দুর্নীতি ও অনিয়ম কবলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমাগত জাতির ভিত্তি দুর্বল করতে থাকবে এবং সরকারকে এক পর্যায়ে দুর্নীতির কালিমায় কলংকিত করবে।


লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Abdul Matin Sikder

২ মাস আগে

ভারতের সেবাদাসী পঁচেগলে পালিয়ে যাবার পর ভারত হাসিনার সাজানো রাষ্ট্রযন্ত্র বা ডিপস্টেট তথা গুপ্তলীগ ওদের সৃষ্ট ইলেকশন ইন্জিনিয়ারিং করে দির্ঘ ১৯ বছরের অভিজ্ঞতায় ধরেই নিয়েছিলো যে একই কায়দায় হাসিনার পরিকল্পনায় সাজানো লীগের গোপন দ্বিতীয় শাখা জামাতশিবিরকে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ওরা দখলে রাখবেই। তাইতো ওরা কোন নিয়মনিতী না মেনেই বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের চাকুরীর আসনগুলি অতিদ্রুত কেড়ে নিয়ে নিজেদের আপনজন বসিয়ে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করে। কিন্তু বিধিবাম নেড়া আর বেলতলায় যায় নাই, এখন জনগনের ভোটে নির্বাচিত জনগনের সরকার ক্ষমতায়। সরকারকে বলছি,.. অতিদ্রুত এই দেশবিরোধী আগাছাগুলোকে একদিনে উপরে ফেলে দিন, জলদি ছাটাই করুন, সাথে জেল জরিমানাও করুন, নাহলে সরকার কলংকমুক্ত হবেনা। সরকারী চাকরী সুযোগ সুবিধা হলো সোনার হরিণ, খুবই দুর্লভ, এই সুবিধা কোনভাবেই যেন দেশের শত্রুরা ভোগ করতে না পারে। বারবার ঘুঘুরা সব খেয়ে খেয়ে মোটা হয়ে কেড়ে নেয় বাংলাদেশের ধান, এইবার এই পিশাচ ঘুঘুদের জবাই করে কাড়তে হবে প্রান। মনে রাখবেন শত্রুদেশ ভারত চট্রগ্রামকে আলাদা করতে বিশেষভাবে টার্গেট করেছে, বিগত ১৯ বছর তাদের লোকজন ঢুকিয়ে এখানে ভরে ফেলেছে। যে চট্রগ্রাম ছিলো বাংলাদেশের প্রান, সেই চট্রগ্রাম এখন শত্রু বোঝাই অপরাধীদের শহর ইশকন পিশাচদের বড় ঘাটি। চট্রগাম এয়ারপোর্টের বিগত ১৯ বছরের যাত্রী আসা যাওয়ার রেকর্ড চেক করা উচিৎ, এই শহরে ভারতীয় হিন্দুদের আনাগোনা খুব বেশী ছিলো।

মন্তব্য করুন