কেন মেক্সিকো আর দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ

কেন মেক্সিকো আর দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ

ফন্ট সাইজ:

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকো। এই ম্যাচটি বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে দুই দলের প্রধান কোচের অতীত ইতিহাসের কারণে। দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রুস এবং মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগুইরে, উভয়েই খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছিলেন। অদ্ভুত এক সমাপতনে, দীর্ঘ ৪০ বছর পর তারা আবার সেই বিশ্বকাপের মতো একই আসরে, এবার কোচ হিসেবে একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।
হুগো ব্রুস তার কোচিং ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন এবং এই টুর্নামেন্টের পরেই অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে, মেক্সিকোর কোচ আগুইরে তার নিজ দেশে আয়োজিত বিশ্বকাপে দলকে সাফল্য এনে দিতে মরিয়া। তারা দুজনেই সেই ১৯৮৬ সালের স্মৃতিচারণ করেছেন এবং এবারের উদ্বোধনী ম্যাচে নিজ নিজ দলের জয়ের জন্য আত্মবিশ্বাসী। ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচে মেক্সিকোর ওপর ঘরের মাঠে জয় পাওয়ার প্রবল চাপ থাকলেও, দক্ষিণ আফ্রিকা কোনো বাড়তি চাপ ছাড়াই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিয়েছে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে মেক্সিকো সিটি একদিকে যেমন উৎসবের আমেজে ভাসছে, অন্যদিকে নানা ধরনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের কারণে শহরটি বেশ চাপের মুখে পড়েছে। ১১ জুন বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষ্যে মেক্সিকো সিটি জুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে একই সময়ে শিক্ষক সংগঠন (CNTE), নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন এবং পরিবহন ও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বড় ধরনের মিছিল ও কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে, যা রাজধানীজুড়ে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জনজীবনকে ব্যাহত করছে।

স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা তৎপর থাকলেও, বিভিন্ন দিক থেকে মিছিলগুলো শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে কোয়োকান ও তলালপান এলাকায় বড় ধরনের যানজট ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতার মধ্যেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাকিরা, জে বালভিন এবং মানাসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পীর পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ফুটবল মহাযজ্ঞের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে বস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্রান্সের ফুটবল দলের আগমন যেন একটি ফ্যাশন শো-তে পরিণত হয়েছিল। মারকাস থুরাম, ওউসমান দেম্বেলে এবং জুল কুন্দের মতো খেলোয়াড়রা শ্যানেল, হার্মিস এবং লুই ভিতোঁর মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের ব্যাগ বহন করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। বিশেষ করে থুরামের সবুজ রঙের শ্যানেল ফ্ল্যাপ ব্যাগ এবং অন্যান্য খেলোয়াড়দের দুর্লভ হার্মিস ব্যাগগুলো ইন্টারনেট এবং ফ্যাশন প্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফরাসি ফুটবলারদের এই পোশাক এবং আনুষঙ্গিক জিনিসের প্রতি ঝোঁক নতুন কিছু নয়, তবে এবারের বিশ্বকাপে তারা তাদের এই স্টাইল স্টেটমেন্টকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে গেছেন। মাঠের বাইরের এই ফ্যাশন সচেতনতা প্রমাণ করে যে, কেবল খেলাতেই নয়, ব্যক্তিগত রুচি ও আভিজাত্যের প্রদর্শনেও তারা বিশ্বসেরা। তাদের এই অসাধারণ ফ্যাশন সেন্স ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ক্যাম্পেইনকে কেবল একটি ক্রীড়া ইভেন্ট নয়, বরং একটি বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনে রূপ দিয়েছে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ভেন্যু হিসেবে মেক্সিকোর আইকনিক এস্তাদিও আজতেকা আবারো ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে। এই স্টেডিয়ামটি এর আগে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করেছিল, আর এবার তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের পর্দা তোলার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে। তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তের পাশাপাশি মেক্সিকো সিটির বর্তমান পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ঠিক আগে শহরজুড়ে বিভিন্ন মিছিল ও সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোতে বিক্ষোভ ও ট্রাফিক জ্যামের ফলে স্টেডিয়ামমুখী দর্শকদের যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে বিশ্বকাপের উত্তেজনা, অন্যদিকে শহরের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে এই ঐতিহাসিক আয়োজনটি মেক্সিকোর জন্য এক ভিন্নধর্মী চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে মেক্সিকোর জাতীয় দলের ম্যাচগুলোতে সমর্থকদের জন্য বিশেষ চমক নিয়ে এসেছে স্পোর্টস বেটিং প্ল্যাটফর্ম ‘কালিয়েন্তে ডট এমএক্স’ (Calientemx)। প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা করেছে যে, মেক্সিকোর প্রতিটি ম্যাচে তারা পুরস্কার হিসেবে মোট ২০ মিলিয়ন পেসো বিতরণ করবে। এই উদ্যোগটি মেক্সিকান ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে এবং বিশ্বকাপের উত্তেজনাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই বিশাল অঙ্কের পুরস্কার জেতার সুযোগ পেতে সমর্থকদের প্রতিষ্ঠানটির নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্তাবলী মেনে অংশগ্রহণ করতে হবে। মেক্সিকোর প্রতিটি ম্যাচের ফলাফল বা নির্দিষ্ট ইভেন্টের ওপর ভিত্তি করে এই অর্থ প্রদান করা হবে, যা সাধারণ দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলবে। তবে এই ধরণের প্রচারণা ও বেটিংয়ের আধিক্য নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক জোকালো (Zócalo) চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে 'ফ্যান ফেস্ট' উন্মুক্ত করা হয়েছে। হাজার হাজার ফুটবল ভক্তের উপস্থিতিতে এই এলাকাটি একটি উৎসবের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে বড় পর্দায় সরাসরি বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার পাশাপাশি বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়েছে। এই বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ দর্শকরা স্টেডিয়ামে না গিয়েও বিশ্বকাপের উত্তাপ ও আনন্দ সরাসরি উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জোকালো চত্বরে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর সরাসরি সম্প্রচার ছাড়াও এখানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পীদের পরিবেশনা এবং নানা ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়েছে। এটি মেক্সিকো সিটির নাগরিকদের জন্য একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যা সারা বিশ্ব থেকে আসা পর্যটক ও সমর্থকদের কাছে ফিফা বিশ্বকাপের উৎসবমুখর পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় ফুটবল অনুরাগী ‘মামা জয়’ (Mama Joy Chauke) ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ দেখার জন্য মেক্সিকো পৌঁছেছেন। তবে এবারের তার এই বিদেশ সফর নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে যে, সরকারি অনুদানের বদলে তিনি এবার একজন ব্যক্তিগত নতুন পৃষ্ঠপোষক বা দাতার আর্থিক সহায়তায় এই বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন, যা নিয়ে জনমনে নানা কৌতূহল দেখা দিয়েছে।

গত কয়েক বছরে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়াঙ্গনে সরকারি অর্থে মামা জয়ের বিদেশ সফর বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিল। এবার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বা অন্য কোনো মাধ্যমে অর্থায়ন সংগ্রহ করে বিশ্বকাপে উপস্থিত হওয়াকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এর পেছনের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সব বিতর্ক ছাপিয়ে মামা জয় বরাবরের মতোই বাফানা বাফানার প্রতি তার অটুট সমর্থন ও ভালোবাসা নিয়ে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছেন।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া হাইতি ফুটবল দলকে তাদের জার্সি পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে। দলের মূল জার্সিটিতে হাইতির বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে এমন কিছু নকশা ও গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হয়েছিল যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে ফিফা বিশ্বকাপের কঠোর নিয়মাবলী এবং টুর্নামেন্টের সার্বিক পরিবেশের কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের এই জার্সি পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলোয়াড়দের জার্সিতে এমন কোনো বার্তা বা প্রতীক থাকা উচিত নয় যা রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরে, কারণ ফিফা সবসময় খেলাধুলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার পক্ষপাতী। এই নির্দেশনার ফলে হাইতি দলকে তাদের নির্ধারিত জার্সির বদলে বিকল্প বা নতুন ডিজাইনের জার্সি পরেই বিশ্বকাপে খেলতে হচ্ছে। এই ঘটনাটি টুর্নামেন্টের নিয়ম-কানুন ও খেলোয়াড়দের পোশাকের সাথে সম্পর্কিত সংবেদনশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন