জাল শেনজেন ভিসা ব্যবহার করে ইতালিতে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের অভিযোগে বাংলাদেশ বিমানের এক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নাম- মোহাম্মদ আখলাছুর রহমান (৪০)। তিনি বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সে জুনিয়র অফিসার, গ্রাউন্ড সার্ভিস, আইএনএস গেইট হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। মঙ্গলবার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি’র সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, গত ২৬শে মে ইতালিগামী বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে করে তিনজন ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ইতালির রোম ফিউমিচিনো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর দেশটির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান অনিক ও অক্ষয় চন্দ্র দাস নামে দুইজনের পাসপোর্টে সংযুক্ত শেনজেন ভিসা পরীক্ষা করে জাল বলে শনাক্ত করে। পরে তাদের আটক করে ২ দিন হেফাজতে রাখে এবং ২৮শে মে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। তবে আরেকজন কৌশলে ইমিগ্রেশন শেষ করে ইতালিতে প্রবেশ করতে পারায় তার নাম-পরিচয় বলেনি সিআইডি। পরে ৩০শে মে এ নিয়ে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয়। দেশে ফেরত আসার পর বিভিন্ন সংস্থা দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে গোটা চক্রের তথ্য বেরিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদে অনিক ও অক্ষয় স্বীকার করেন, জনপ্রতি ৩০ লাখ টাকার চুক্তিতে একটি চক্রের সহায়তায় তারা দেশ ছেড়েছিলেন। ইতালি পৌঁছাতে অগ্রিম দিয়েছিলেন জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা।
বদরুল আলম মোল্লা বলেন, দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের ইমিগ্রেশনে ও বোর্ডিং পাসের কোথাও এই যাত্রীদের ধরা যায়নি। প্রথমে তারা নেপালগামী ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করেন। যেহেতু দেশটিতে যেতে ভিসার প্রয়োজন হয় না, তাই সেই বোর্ডিং পাসেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে ফেলেন। কিন্তু সেই বোর্ডিং পাসটি আসল থাকলেও ওই ফ্লাইটের যাত্রী তালিকায় তাদের নাম ছিল না। ঘটনার সময়ের ঢাকা বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিআইডি’র এই কর্মকর্তা বলেন, বোর্ডিং পাস হাতে পাওয়ার পরই তারা ইমিগ্রেশন কমপ্লিট করেননি। তারা পাঁচ নম্বর গেট দিয়ে, যেটি স্টাফ গেট, সেটি দিয়ে বের হয়ে যান। সেখানে কার পার্কিংয়ে একটি গাড়িতে বসে একজনের কাছ থেকে ইতালির বোর্ডিং পাস, টিকিট ও ভুয়া ভিসা সংগ্রহ করে।
তিনি আরও বলেন, পরে ফিরে এসে নেপালের বোর্ডিং পাস দিয়ে ইমিগ্রেশন করার পর আমরা দেখতে পাই, বিমান বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা এই তিনজন যাত্রীকে সহায়তা করছেন। তারা একপর্যায়ে ওয়াশরুমে যান, যা সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত না। সেখানে গিয়ে তারা জাল শেনজেন ভিসাটি পাসপোর্টে সংযুক্ত করে। জাল ভিসায় বিমানে ওঠার আগমুহূর্তে আইএনএস গেটে গেলে সেখানে দায়িত্বরত গ্রাউন্ড অফিসার আখলাছুর তাদের পার করে দিয়েছিলেন। যেহেতু তাদের ইমিগ্রেশন করা হয়েছিল নেপালগামী বোর্ডিং পাসে, তাদের ইতালিগামী প্লেনে ওঠানোর জন্য শুধু আইএনএস গেটটাই ছিল। সেখানে আখলাছুর ছিলেন, তার সহায়তায় গেটটি তারা পার হয়ে যান এবং ইতালিতে তারা পৌঁছেও যান। যখন ইতালিতে পৌঁছান তখন ইতালির ইমিগ্রেশন পুলিশ দুইজনের জাল ভিসা শনাক্ত করে দেশে ফেরত পাঠায়।
বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের হোতা ও অন্য সহযোগীদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। শুধু দালাল চক্র, এয়ারলাইন্সের অথবা আমাদের যে টিকেটিং এজেন্সি বা রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের মধ্যে আমরা তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। সরকারি কর্মকর্তা বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান অথবা আমাদের সিভিল এভিয়েশন সংক্রান্ত যারাই মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের চেষ্টা করবে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করবো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা মৌখিকভাবে স্বীকার করেছেন আখলাছুর। যেহেতু তাকে জামালপুর থেকে আনা হচ্ছে, এরপর আমরা তাকে আদালতে পাঠাবো। কিন্তু অন্য কোনো ঘটনার ব্যাপারে সে এখনো মুখ খোলেনি। এ ধরনের প্রতারণা এড়াতে ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে বোর্ডিং পাসের লিস্টের সমন্বয় থাকা উচিত বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা।
