প্রতিশোধের মানসিকতা বদলাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বিএনপি বিট’ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকসহ গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জনপ্রশাসন কক্ষে বিভিন্ন টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী ও বার্তা প্রধানদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং তাদের দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়ন করেন তিনি। গতকাল বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় করলেন বিএনপি বিট সাংবাদিকদের সঙ্গে। তিনি তাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি যখন বলেছিলাম যে, আসুন আমাদের নিজের চিন্তা কিছুটা আমরা পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। হ্যাঁ আমার সঙ্গে যা হয়েছে, আপনি এখন প্রতিশোধ নিলে সেটা আপনি ফেরত পাবেন বা একদম আগের মতো হয়ে যাবে? তা হবে না। আমরা আমাদের সেই মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে এসে আমরা কী করতে পারি দেশের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কী করতে পারি? পারি বা না পারি সেটা হচ্ছে পরের ব্যাপার, চেষ্টা তো করতে পারি, সাকসেসফুল হওয়া পরের ব্যাপার। অন্তত এই মাইন্ডসেট নিয়ে আমরা কেন সামনের দিকে এগোবো না।
তিনি আরও বলেন, আমরা একটি ব্যাপারে সবাই কনসার্ন। আপনাদের পত্রিকায় প্রায় এরকম নিউজগুলো আসে দেখি, যেমন ধরেন- আমাদের ইয়াং জেনারেশনের ড্রাগের একটা প্রবলেম দেখা দিয়েছে। হয়তো বিশ্বব্যাপী কম বেশি আছে, এখন আপনি কতোজনকে ধরবেন, কতোজনকে চিকিৎসা দেবেন, কতোজনকে আপনি কাউন্সিল করবেন? সবকিছু একটা রিসোর্সের লিমিট আছে, ক্যাপাবিলিটি আছে, ক্যাপাসিটি আছে।
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান আরও বলেন, তাহলে বিষয়টিকে আর অন্য কীভাবে এড্রেস করা যায়? এটা এড্রেস করার আরও কিছু উপায় আছে। দেখুন ব্যাপারটাকে আমাদের অবশ্যই এড্রেস করতে হবে যে, এই সমস্যা থেকে কীভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বের করে নিয়ে আসবো। এই চিন্তার পাশাপাশি বা এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার পাশাপাশি আরেকটা বিষয় আছে যে, আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তো আমার সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে, তরুণদেরকে যে এনার্জিটা তাকে বার্ন করার একটা এভিনিউ দিতে হবে, একটা স্কোপ দিতে হবে, সে সুযোগ তাকে ক্রিয়েট করে দিতে হবে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা ঢাকা শহর সহ বাংলাদেশে যেখানেই তাকাই না কেন কয়টি খেলার মাঠ আছে, অর্থাৎ আমাদের যারা এখন এসবের (ড্রাগ) মধ্যে ইনভলভ হয়ে যাচ্ছে অথবা সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে আছে বুঝে হোক না বুঝে হোক ভালো- মন্দ মধ্যে পার্টিসিপেট করে ফেলছে। খেলার মাঠ সব বন্ধ। ছেলে হোক, মেয়ে হোক উভয়ের জন্য খেলার মাঠ বলতে কিছু নেই।
সরকারপ্রধান বলেন, আমি আজকের দিনটা আমাদের জন্য একটা সংবাদপত্র জগতের জন্য, বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন বৈকি। আজকে এই দিনে বাংলাদেশের সকল সংবাদপত্র একসময় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, হাতেগোনা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ছিল। সেখান থেকে আজকে আমরা এতগুলো সাংবাদিক ভাইদের সঙ্গে কথা বলছি। তার মানে একটা জিনিস প্রমাণিত হয়েছে যে, এখন সংবাদপত্রের যে টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল, সেটি অন্তত এই মুহূর্তে নেই।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, যেভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। ৪টা সংবাদপত্রকে বন্ধ করে দিয়েছিল। একই সময় আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে বন্ধ মানে বিলুপ্ত করে বাকশাল নামে একটা দল গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন, উনি যেরকম বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলেন, একই সঙ্গে সংবাদপত্রের উপর থেকে যে রেস্ট্রিকশন ছিল- সেটাও তুলে নিলেন। পরবর্তী সময় কী হয়েছে, কতোটুকু হয়েছে- এটা আপনাদের কথা থেকেও বেরিয়ে এসেছে।
তরুণ প্রজন্মের সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ঘাটতি আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্কুল পর্যায় থেকে এ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়ার কথা তুলে ধরেন।
লন্ডনে সবুজ গাছ-গাছালির কথা স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা তো এখন আমি খুব মিস করি। ওই গাছগুলো বিশাল বিশাল সব গাছ খুব ভালো লাগতো আমার আর সামারে- আমাদের দেশে কোকিলের মতন একটা পাখি ছিল। তো একটা ডাক দিলে আরেকটা ডাক দিতো বিকালের দিকে। মাঝে মাঝে আমি ওদের ওই গান শোনার জন্যই হাঁটতাম। যেদিন কাজ থাকতো না গান শোনার জন্য আমি হাঁটতাম। একটা ডাকে আরেকটা ডাকে, মানে ইকোর মতো হচ্ছে পাখিগুলোর ডাক। খুব সুন্দর লাগতো। খুব মিস করি আমি।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা আমাকে অনেক সাহায্য করতে পারেন, শুধু সরকার একা পারবে না, আপনার সহযোগিতা আমার লাগবে, আপনার সহযোগিতা না পেলে তো আমি বুঝতে পারবো যে, কাজটা ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে। সহযোগিতা পেলেই অন্তত বুঝতে পারবো যে কাজটা ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে অথবা ভালো কাজের পথটা আপনাকেও দেখাতে হবে, আমি দেখবো আমার মতো করে আপনি আপনাকেও দেখাতে হবে। অর্থাৎ আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। এই সহযোগিতাটা আমি আপনাদের কাছে চাইছি। আমাকে যদি আপনারা হেল্প করেন, আমার জন্য কাজটা করতে অনেকটা ইজি হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদেরকে আমাদের পরিবেশটা বাঁচাতে হবে, আমাদেরকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে, আমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে হোক আমাদেরকে রাইট ট্র্যাকে রাখতে হবে। সেটা শিক্ষার মাধ্যমে হোক, সেটা কালচারের মাধ্যমে হোক, সেটা স্পোর্টসের মাধ্যমে হোক। সেটা মানবিক সামাজিক ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো তাদের মাঝে দেয়ার মাধ্যমে হোক।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় সভায় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, স্পিচ রাইটার এসএএম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন, শাহাদাত হোসেন স্বাধীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
