অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততা কিংবা দিনের কর্মব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস ‘আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ সঙ্গে দেয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি লিংক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও সম্ভাব্য আইনি ঝামেলার ভয় দেখিয়ে এমন বার্তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্যাংক হিসাব বা কার্ড থেকে টাকা কেটে নিচ্ছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- রাব্বি শেখ, রিয়াদ হোসেন, সাজ্জাদ হোসেন। রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি’র সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিআইডি’র সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সানা শামিনুর রহমান।
তিনি বলেন, ডিএমপি’র এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক মামলা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর একটি প্রতারক চক্র এটিকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা শুরু করে। চক্রটি বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটের অনুরূপ একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছিল। প্রতারক চক্রটি বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে জানাতো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করায় মামলা হয়েছে। এসএমএসে থাকা লিংকে প্রবেশ করলে ভুক্তভোগীদের বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি করা একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে নেয়া হতো। সেখানে জরিমানা পরিশোধের কথা বলে ব্যাংক কার্ডের তথ্য, অ্যাকাউন্টের তথ্য ও ওটিপি সংগ্রহ করতো প্রতারকরা। এমনকি দ্রুত জরিমানা পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে এমন প্রলোভনও দেখানো হতো। ওটিপি সংগ্রহের পর প্রতারকরা ভুক্তভোগীদের ব্যাংক হিসাব থেকে নিজেদের অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করতো। এভাবে গ্রেপ্তার তিন আসামি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোট সাত লাখ ২৫ হাজার ছয়শ’ টাকা আত্মসাৎ করেছে। সাইবার পুলিশ সেন্টারের সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্টের অভিযানিক দল প্রযুক্তিগত তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।
সানা শামিনুর রহমান বলেন, প্রথমে খুলনার বটিয়াঘাটা এলাকা থেকে রাব্বি শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফেনীর সদর এলাকা থেকে রিয়াদ হোসেন এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে সাজ্জাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক ভুক্তভোগী তার মোবাইল ফোনে বিআরটিএ’র নামে ট্রাফিক জরিমানা সংক্রান্ত একটি এসএমএস পান। এসএমএসে দেয়া লিংকে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তিন হাজার টাকা জরিমানা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ করলে এক হাজার পাঁচশ টাকা দিতে হবে বলেও উল্লেখ ছিল। বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি, জরিমানা পরিশোধের জন্য ভুয়া অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন। সেখানে স্ত্রী’র ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্য ও ওটিপি প্রদান করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখতে পান, জরিমানা পরিশোধ না হয়ে স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে ৩ লাখ টাকা অন্য একটি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরবর্তীতে একই ধরনের আরও দু’টি অভিযোগ পাওয়ার পর সিআইডি’র সাইবার পুলিশ সেন্টার তদন্ত শুরু করে। তদন্তে উঠে আসে, চক্রটি ভুয়া ট্রাফিক মামলা ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে ফিশিং লিংকের মাধ্যমে মানুষের ব্যাংক কার্ড, অ্যাকাউন্ট ও ওটিপি তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করছিল।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে ধারায় মামলা করা হয়েছে। ডিএমপি’র এআই ক্যামেরার মাধ্যমে যেসব ট্রাফিক মামলা করা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো এসএমএস পাঠানো হয়নি। ডিএমপি’র পক্ষ থেকে ম্যানুয়ালি ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে শুধু ইউসিবি ব্যাংক ও কমিউনিটি ব্যাংকের মাধ্যমে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। ট্রাফিক জরিমানার নামে কেউ মোবাইলে এসএমএস, ফোনকল বা অন্য কোনো মাধ্যমে তথ্য চাইলে সেটি প্রতারণা হতে পারে।
