ফুটবল যদি দুই মেরুর গল্প হয়, তাহলে এক প্রান্তে থাকবেন লিওনেল মেসি, আর অন্য প্রান্তে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গোল, ট্রফি, ব্যক্তিগত পুরস্কার, রেকর্ড এবং প্রভাব- সবকিছুই এই দুই কিংবদন্তি ভাগ করে নিয়েছেন নিজেদের মধ্যে। তবে তুলনার এই দীর্ঘ ইতিহাসে একটি জায়গায় এখনো ফারাক রয়ে গেছে। তাহলো বিশ্বকাপ। কাতারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অধ্যায় পূর্ণ করেছেন মেসি। কিন্তু বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি এখনো অধরা রোনালদোর কাছে। আর সেই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে পারে তার ফুটবল-জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে আবেগঘন মিশন। যার শুরুটা হিউস্টনে হবে আজ গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর ম্যাচের মধ্যদিয়ে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্যের আরেক নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
গতি, শারীরিক সক্ষমতা, গোল করার ক্ষুধা এবং অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এমন এক ক্যারিয়ার, যা আধুনিক ফুটবলের মানদণ্ড বদলে দিয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে উইং থেকে বল নিয়ে পুরো রক্ষণভাগ ভেঙে গোল করা ছিল তার পরিচয়। তিনি শুধু গোলদাতা ছিলেন না, ছিলেন ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণকারী খেলোয়াড়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার খেলার ধরন। বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপের পর সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। আগের মতো দীর্ঘ দৌড়ে প্রতিপক্ষকে ছাপিয়ে যাওয়ার বদলে এখন তিনি অনেক বেশি বক্স-কেন্দ্রিক, সুযোগসন্ধানী এবং অভিজ্ঞ ফিনিশার। বল কম ছুঁয়েও ম্যাচে প্রভাব ফেলার শিল্প আয়ত্ত করেছেন তিনি। সমালোচকদের মতে, বর্তমান রোনালদোকে তার তরুণ বয়সের রোনালদোর সঙ্গে তুলনা করাই সবচেয়ে বড় অবিচার। কারণ, ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এত দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের ধরে রাখতে পেরেছেন।
২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিদায়ের পর রোনালদোর কান্নার দৃশ্য বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে। অনেকেই ভেবেছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে হয়তো এটাই তার শেষ অধ্যায়। কিন্তু রোনালদোর গল্পে শেষ কথাটা সাধারণত এত সহজে লেখা হয় না। ২০০৪ সালে নিজ দেশের মাটিতে ইউরোর ফাইনালে হারের পর তিনি কেঁদেছিলেন। পরে সেই হতাশাকে শক্তিতে রূপ দিয়ে ২০১৬ সালে দেশকে এনে দেন প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা- ইউরো ২০১৬। আবার ইউরো ২০২৪-এও আবেগের মুহূর্ত দেখা যায়, যখন শেষ ষোলোয় পেনাল্টি মিস করেন। এরপরও দলকে এগিয়ে নিতে নিজের ভূমিকা রাখেন। রোনালদোর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার মানসিকতা। অনেকে যখন ক্যারিয়ারের শেষের হিসাব শুরু করেন, তখনো তিনি নতুন লক্ষ্য খুঁজে নেন। বয়স ৪১ ছুঁলেও প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। ২০০৩ সালে পর্তুগাল জাতীয় দলের অভিষেক হওয়া রোনালদো এখন পর্যন্ত ২২৮টি ম্যাচে গোল করেছেন ১৪৩টি। যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ। বিশ্বকাপের ২২ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ৮।
আজকের পর্তুগাল দলও আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। রোনালদোকে ঘিরে নয়, বরং শক্তিশালী একটি সমষ্টিগত কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে দলটি এগোচ্ছে। দলে আছেন রুবেন দিয়াস, নুনু মেন্দেস, জোয়াও কানসালো, ভিতিনহা, জোয়াও নেভেস, ব্রুনো ফার্নান্দেস, বারনার্দো সিলভা, পেদ্রো নেতোরা ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলার। একসময় পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন রোনালদো নিজে। এখন তিনি হয়তো দলের একমাত্র ভরসা নন, কিন্তু তিনি এখনো দলের সবচেয়ে বড় প্রতীক। ক্লাব পর্যায়ে তার সেরা সময় হয়তো পেছনে পড়ে গেছে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দ্বিতীয় অধ্যায় শেষ করে তিনি যোগ দেন সৌদি প্রো লীগের আল নাসের ক্লাবে। সৌদি অধ্যায় হয়তো তার ক্যারিয়ারের সংজ্ঞা নয়- বরং দীর্ঘ যাত্রার শেষভাগের একটি অংশমাত্র। তবে ইতিহাস এখনো পুরোপুরি লেখা শেষ হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপ রোনালদোর জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি হতে পারে তার ক্যারিয়ারের শেষ বড় মঞ্চ, শেষ স্বপ্ন, শেষ চেষ্টা। যদি বিশ্বকাপ একদিন তার হাতে ওঠে, তাহলে ফুটবলের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি অধ্যায় নতুন অর্থ পাবে। আর যদি না-ও ওঠে-তবুও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গল্প অসম্পূর্ণ থাকবে না। কারণ কিছু কিংবদন্তি ট্রফি দিয়ে নয়, নিজেদের দীর্ঘস্থায়িত্ব, মানসিকতা এবং প্রভাব দিয়েই অমর হয়ে যান।
