পর্যাপ্ত টাকা মিলছে না এটিএম বুথে, ভোগান্তি

পর্যাপ্ত টাকা মিলছে না এটিএম বুথে, ভোগান্তি

ফন্ট সাইজ:

২০ হাজার টাকা তোলার জন্য গত বুধবার দুই ঘণ্টা ঘুরেছেন আরশাদ হোসেন। মোহাম্মদপুরের ছয়টি বুথ ঘুরেও মেলেনি টাকা। তার ভাষ্য, কারণ জানতে চাইলে নমনীয় আচরণ করেননি ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার। বুথে টাকা না পেয়ে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করে সেই টাকা তুলেছেন। তিনি বলেন, এই টাকা তুলতে যে ক্যাশ আউট চার্জ লেগেছে, এটাই আমার ক্ষতি। নগদ টাকার সংকট হয়েছে ইসলামী ব্যাংকে কিন্তু অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে কেন সমস্যা হবে, সেটাই বুঝে আসছে না?

আরশাদের মতো অনেকেই ভুগছেন এই সমস্যায়। রোববার ও সোমবার রাজধানীর মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আগারগাঁও, মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকা, পান্থপথ সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মিলেছে ভোগান্তির এই চিত্র। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের নিচ তলায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের এটিএম বুথ। রোববার রাতে দেখা যায় এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের বুথে টাকা উত্তোলন করা যাচ্ছে না। সোমবার আগারগাঁও অফিস পাড়ায় অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের বুথ ও ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের বুথে টাকা মেলেনি। তবে স্বল্প পরিমাণ পাচ্ছেন অন্য ব্যাংকের গ্রাহকরা, ২০ হাজার টাকা। ৬০ ফিট সড়ক জুড়ে আটটি বুথেও একই চিত্র দেখা গেছে। ছয়টি বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না অন্য ব্যাংকের গ্রাহকরা।

ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী জানান, এই বুথে নিয়মিত সিরিয়াল দিয়ে মানুষ টাকা উঠায়। অর্ধেকের বেশি থাকে অন্য ব্যাংকের গ্রাহক। যার কারণে ডাচ্‌-বাংলার গ্রাহকরা অনেক সময় টাকা পান না। এজন্য অন্য গ্রাহকদের টাকা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। এই শাখার ফাস্ট ট্র্যাক অফিসার সুমন হাওলাদার বলেন, আপাতত আমাদের ব্যাংক থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে অন্যান্য ব্যাংকের গ্রাহকদের কার্ডের সুবিধা না দিতে। আমরা নিয়মিত টাকা রিফিল করলেও ঈদের কয়েকদিন আগ থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই টাকা শেষ হয়ে যায়, এজন্যই এই সিদ্ধান্ত বলে জানানো হয়েছে।

সোমবার বেলা ১টার দিকে দেখা গেছে, মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় অবস্থিত সিটি ব্যাংকের বুথে অন্য ব্যাংকের কার্ডের টাকা তোলা যাচ্ছে না। এ বুথে দিনে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত তোলা যাচ্ছে। অনেকেই এসে টাকা তুলতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন। সেখানে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ড জানান, এই মুহূর্তে অন্য ব্যাংকের কার্ড দিয়ে টাকা তোলা বন্ধ রয়েছে। কাজীপাড়ায় অবস্থিত কমার্শিয়াল ব্যাংকের বুথে কয়েকদিন থেকে অন্য কার্ডে টাকা তুলতে ঝামেলা হচ্ছে। সেখানে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ড বলেন, এখানে কমার্শিয়াল ব্যাংকের গ্রাহকরা কার্ডের মাধ্যমে ১ জন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছেন। অন্য ব্যাংকের কার্ড হোল্ডাররা তুলতে পারছেন না। বেলা ২টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের বুথে টাকা ছিল। এখানে বেশ কিছু গ্রাহকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ বুথে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা তুলতে পারছেন।

ফারজানা আক্তার নামের এক গ্রাহক টাকা তুলে বের হয়ে জানান, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এই বুথে টাকা পেয়েছি। ১০ হাজার টাকা তুলতে পেরেছি। একটু দূরে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের আরেকটি বুথ বন্ধ দেখা যায়। সেখানে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটিএম বুথ সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে বলে নোটিশ ঝুলানো ছিল। সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী কথা বলতে রাজি হননি।

সব থেকে বেশি সমস্যার মুখে পরেছেন ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা। আগারগাঁও ও ৬০ ফিট এলাকায় দু’টি বুথ খোলা থাকলেও ছিল না টাকা। নিরাপত্তাকর্মী এর কারণ জানেন না। আগারগাঁও বুথে টাকা নেই গত দুইদিন থেকে। আর ৬০ ফিট বুথে টাকা নেই প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে। এই বুথে টাকা তুলতে আসেন হুমায়ুন নামে এক গ্রাহক। তিনি ছেলেকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে বুথে যান। তবে টাকা পাননি। তিনি বলেন, বুথে টাকা না পেয়ে দুইবার টাকা ট্রান্সফার করেছি। কিন্তু এই টাকা তুলতে অনেক টাকা চার্জ গুনতে হয়।

পাশেই অবস্থিত এসবিএসি ব্যাংকের বুথে অনেকেই অন্য ব্যাংকের কার্ড দিয়ে টাকা তুলছিলেন। সেখানে অন্য ব্যাংক কার্ড দিয়ে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা তোলা যাচ্ছিল। মিরপুর-২ নম্বরে অবস্থিত ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের বুথে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী জানান, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের গ্রাহকরা ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছেন। বর্তমানে সব ব্যাংকের কার্ড দিয়ে টাকা তোলা যাচ্ছে না। অন্য ব্যাংকের গ্রাহক কার্ড দিয়ে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা তুলতে পারছেন। বেলা ৩টায় কল্যাণপুরে সাউথইস্ট ব্যাংকের বুথে গিয়ে দেখা যায়, টাকা শেষ হয়ে গেছে। এ সময় দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ড জানান, মানুষ সারাদিন টাকা তুলেছেন। একটু আগেই টাকা শেষ হয়েছে। ব্যাংকের লোকজন সময়মতো টাকা ঢুকাবেন।

নিরাপত্তাকর্মী ও গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা, মে মাসের শেষের দিকে ঈদ থাকায় প্রচুর পরিমাণে টাকা উত্তোলন করেছেন তারা। আবার মাসের শুরুতে (জুন) টাকা উঠানোর একটা চাপ থাকে। দুটো ঘটনায় গ্রাহকরা বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করেছেন। যার কারণে বুথগুলোতে চাপ বেড়েছে।

রাজধানীর ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের একটি জোনের দায়িত্বে থাকা একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ডাচ্‌-বাংলায় তারল্য সংকট নেই। কিন্তু ঈদের আগে লক্ষ্য করলাম পূর্বের ঈদের তুলনায় অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের টাকা তোলার হার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। যার কারণে ঈদের সময় আমাদের ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকার কারণে ভোগান্তিতে পড়েন। এ ছাড়া মাসের শুরুতেও একটা টাকা উত্তোলনের চাপ থাকে। সেখানেই এই রেশিও অব্যাহত থাকলো।
তিনি বলেন, এরপর আমরা যেসব বুথে চাপ বেশি সেসব বুথে অন্যান্য ব্যাংকের কার্ডধারীদের সুবিধা লিমিটেড করে দেয়া শুরু করি। এরপর ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়ানো হয়। আমাদের একটা লিমিট আছে। ঊর্ধতনদের নির্দেশনা এই সুবিধাটা যেনো আমাদের গ্রাহকরা পান। তবে ব্যাংকের তরফে কেন্দ্রীয়ভাবে এই রকম কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে জানানো হয় ব্যাংকটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে অস্থিতিশীলতার কারণে গ্রাহকদের আস্থার জায়গাটা সংকীর্ণ হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপির কারণে মানুষের আস্থা নড়বড়ে হয়েছে। অনেক মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে। যার কারণে ব্যাপক তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবই পড়েছে বুথগুলোতে। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটা ইতিবাচক।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন