কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ বা ‘কেআইবি’। ৩৩ হাজার ৯০৪ সদস্যের এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগপন্থি বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমানে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া আরও দুটি পক্ষ। ক্ষমতার দাপট দেখাতে বাড়ানো হচ্ছে বহিরাগতদের উপস্থিতি। হামলা-ভাঙচুর, প্রশাসককে অবরুদ্ধ এমনকি থানায় মামলা পর্যন্ত হয়েছে। ভয়ভীতি দেখিয়ে তহবিল থেকে নেয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা। জীবনের ভয়ে টাকা দেয়ায় আবার শোকজও করা হয়েছে হিসাব বিভাগের সহকারীকে।
আর এসব নিয়েই তোলপাড় চলছে সংগঠনটির ভেতরে।
কেআইবি’র সূত্র বলছে, নিয়মিত নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০০৯ সালের পর সংগঠনটির আর কোনো নির্বাচন হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কেআইবি’র নিয়ন্ত্রণ নেয় বিএনপিপন্থি কৃষিবিদদের সংগঠন অ্যাগ্রিকালচারিস্টস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের-এ্যাব’র নেতারা। কিন্তু হলরুম ভাড়া (কেআইবি স্কয়ার) ও খাবারের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে একের পর এক বিবাদ শুরু হয় নিজেদের মধ্যে। এরই জেরে গত বছরের ১৭ই জানুয়ারি দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। কয়েকজন আহতও হন।
এরপর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে কেআইব’র নির্বাচনের জন্য গত ২০শে জানুয়ারি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আব্দুর রব খানকে কেআইবি’র প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তবে তিনি নির্বাচন কমিশন গঠন ও দফায় দফায় নিজের মেয়াদ বৃদ্ধি করলেও দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে সেই নির্বাচন আজও হয়নি। উপরন্তু কেআইবি’র নিয়ন্ত্রণ নিতে দুই পক্ষই মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর এরই প্রেক্ষিতে গত ২৭শে অক্টোবর বিকালে কেআইবি ভবনে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এ্যাবের কিছু সদস্য। ওইদিন রাতেই কেআইবি কর্তৃপক্ষ এ্যাবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার, সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লব, কৃষিবিদ সবুর, আশরাফ, টিপু, এমদাদ হোসেন ও শাহাদাত হোসেন চঞ্চলসহ ৬০/৭০ জনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা করে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, কেআইবি’র প্রশাসক লে. কর্নেল (অব.) মো. আব্দুর রব খানকে তার দপ্তরে প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখে তাকে পদত্যাগের জন্য হুমকি দেয়া হয় এবং ভবিষ্যতে যেন কেআইবিতে না আসেন, সে সতর্কবার্তাও দেয়া হয়েছে। এ সময় তারা ভবনের নিরাপত্তারক্ষী ও অফিসকর্মীদের জোর করে বের করে দেন। প্রশাসক ও নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের নামফলক ও সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। নিচতলার সিসি ক্যামেরার কম্পিউটার থেকে হার্ডডিস্ক পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয় মামলায়। ওই ঘটনার পর কেআইবি স্কয়ার পরিদর্শনও করে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা।
তবে পরদিনই গত ২৮শে অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে এ্যাবের একাংশের নেতারা। তারা তখন একজন নিরপেক্ষ ও জ্যেষ্ঠ কৃষিবিদকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, প্রশাসক আবদুর রব খানের নিয়োগ বাতিল এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার চান। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক ড. কামরুজ্জামান কায়সার অভিযোগ করে বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর আবদুর রব খানকে মাত্র ৯০ দিনের জন্য প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন আয়োজন করে দায়িত্ব হস্তান্তর করা। কিন্তু তিনি তা না করে কেআইবি’র তহবিল থেকে কোটি টাকার উন্নয়ন, মেরামত এবং নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিজের ইচ্ছামতো সাতজনকে চাকরি দেন। যাদের বেতনভাতা বর্তমান স্থায়ী কর্মকর্তাদের দ্বিগুণের চেয়ে বেশি। টেন্ডার ছাড়াই পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে কোটি কোটি টাকার মেরামত কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এরপরই গত ১১ই এপ্রিল কেআইবি প্রশাসকের অপসারণ এবং অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে তলবি সাধারণ সভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত সেই সভার সভাপতিত্ব করা নিয়েও দুই পক্ষের হট্টগোলে সভাটি স্থগিত করা হয়। সেদিনের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, বেলা ১২টায় সভার কার্যক্রম শুরু হলে প্রথমেই সভাপতিত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। উপস্থিত সিনিয়র সদস্যরা ইনস্টিটিউশনের সাবেক সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ কৃষিবিদ ইব্রাহিম খলিলের নাম প্রস্তাব করেন। তবে একাংশ এর বিরোধিতা করে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য কৃষিবিদ গোলাম হাফিজ কেনেডির নাম প্রস্তাব করে। সে সময় এগ্রিকালচারালিস্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) সদস্য সচিব শাহাদত হোসেন বিপ্লব বলেছিলেন, সভার সভাপতির বিষয়ে সিনিয়র কৃষিবিদরা সিদ্ধান্ত দিতে না পারলে, এ্যাবের নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত দেবেন। এ সময় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কর্মকর্তা ও এ্যাবের যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম শফিক আপত্তি তুলে বলেন, এটি এ্যাবের কোনো দলীয় অনুষ্ঠান নয়, তাই এ্যাবের সিদ্ধান্ত তিনি মানবেন না। একপর্যায়ে সেই সভাও পণ্ড হয়ে যায়।
কিছুদিনের মাথায়ই কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের নতুন প্রশাসক হিসেবে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আজিজুল ইসলামকে নিয়োগ দেয়া হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সংস্থার গঠনতন্ত্র মোতাবেক নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তর করতে হবে। এ ছাড়াও প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে সংস্থার আয়-ব্যয়ের বিবরণসহ মাসিক অগ্রগতির প্রতিবেদন আবশ্যিকভাবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত সমাজসেবা অধিদপ্তরে পাঠাতে হবে।
তবে এরই মধ্যে কেআইবি তহবিল থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৪ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও এগ্রিকালচারালিস্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার কেআইবি প্রাঙ্গণে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। কেআইবি’র হিসাব বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক দিলিপ কুমার সরকারের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তিনি অভিযোগ করেন, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে গত ২১, ২৪ ও ২৫শে মে তিন দফায় প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে চার লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে ৪ লাখ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এর আগে গত ৯ই মে একই কারণ দেখিয়ে আরও পাঁচ লাখ টাকা নেয়া হয়েছিল। ঘটনার সময় কৃষক দল নেতা শাহাদাত হোসেন বিপ্লবের সঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষক দলের যুগ্ম-আহ্বায়ক মির্জা তাহমিদ আহমেদ (রিজভী), আমান, টিপুসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। দিলীপ কুমার সরকার বলেন, কৃষিবিদ রিজভীকে তিন দফায় চার লাখ টাকা দিয়েছি। তবে গত বুধবার দিলীপ কুমার সরকার আবার ভোল পাল্টে বলেছেন, তাকে কেউ ভয়ভীতি দেখায়নি। সংস্কার কাজের বিল হিসেবেই তিনি ওই টাকা দিয়েছেন।
এই টাকা দেয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর কৃষিবিদদের মধ্যে নানা গুঞ্জন শুরু হয়। গত ৪ঠা জুন বিকাল পাঁচটায় আরেক দল কৃষিবিদ বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেন। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুপুরের পর এ্যাবের কয়েকজন নেতা ও তাদের সমর্থকরা কেআইবি’র মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন। অন্যদিকে বিক্ষোভের ডাক দেয়া কৃষিবিদরা ভবনের ভেতরে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই কেআইবি’র বাইরে দুই পক্ষের কয়েকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এদিকে নিয়ম ভেঙে নিজের কাছে টাকা রাখা ও অন্যজনকে দেয়ার ঘটনায় গত ১লা জুন কেআইবি’র প্রশাসক কৃষিবিদ মো. আজিজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দিলীপ কুমার সরকারকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। নোটিশে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে কেআইবি’র তহবিল থেকে চার লাখ টাকা জনৈক রিজভী সাহেবকে প্রদান করেছেন। আপনি কেআইবি’র একজন দায়িত্বশীল কর্মচারী হিসেবে কীভাবে এতগুলো টাকা কেআইবি’র ব্যাংক হিসাবে জমা না করে নিজের কাছে গচ্ছিত রেখেছেন এবং অনৈতিকভাবে অন্যকে লাভবান এবং নিজে লাভবান হওয়ার জন্য অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও অবহেলা করেছেন? আপনার এরূপ কার্যকলাপ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের চাকরিবিধি পরিপন্থি। পত্র প্রাপ্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা না দিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে হিসাব সহকারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, গত ৩০শে মে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি উপলক্ষে কিছু সংস্কার কাজের জন্য আমি প্রশাসকের অনুমতি নিয়েই অগ্রিম তিন দফায় চার লাখ টাকা দিয়েছি।
এ বিষয়ে টাকা নেয়ার অভিযোগ ওঠা কৃষক দল নেতা মির্জা তাহমিদ আহমেদ রিজভী বলেন, যে সরকারই ক্ষমতাই থাকুক প্রধানমন্ত্রীর প্রোগ্রাম থাকলে সংস্কার কাজ করা হয়। তবে এ কাজগুলো আগে কেআইবি’র স্টাফরা করতো। কিন্তু তাদের কাজ অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় ও এবার ঈদের আগে সংস্কার কাজ করার পর্যাপ্ত সময় না থাকায় আমরা কাজটি করেছি। ওই কাজের জন্যই কেআইবি’র হিসাব সহকারী আমাদের তিন দফায় চার লাখ টাকা দিয়েছেন। পরবর্তীতে জেনারেটর, চায়ের টেবিল সংস্কার, টাইলস, আটতলা ভবনের রংয়ের কাজ ঈদের আগে শেষ করে আমরা পাঁচ লাখ ১৫ হাজার টাকার বিল জমা দিয়েছি।
বিষয়টি নিয়ে কেআইবি’র প্রশাসক কৃষিবিদ মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, কেআইবি তহবিল থেকে অর্থ দেয়ার বিষয়টি নিয়মবহির্ভূত। ইতিমধ্যে হিসাব সহকারী দিলীপ কুমার সরকারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে।
