বিদ্যুৎ চুক্তির বাইরে যে বড় প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ায় অংশীদারিত্ব নাকি প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি?

বিদ্যুৎ চুক্তির বাইরে যে বড় প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ায় অংশীদারিত্ব নাকি প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি?

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিকে ঘিরে নতুন করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি বাণিজ্যিক বা বিদ্যুৎ খাতের বিষয় নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। চুক্তিটি যদি সত্যিই বাংলাদেশের জন্য ‘অত্যন্ত অসম’ এবং ‘বাংলাদেশবিরোধী’ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি দেশের ক্ষতির বিষয় নয়; বরং সমগ্র অঞ্চলে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিকেই দুর্বল করতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় অর্থনীতি, জ্বালানি ও কূটনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বের দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু সেই সহযোগিতা তখনই টেকসই হবে, যখন তা পারস্পরিক স্বার্থ, ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে।

ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। একই সঙ্গে বাংলাদেশও গত দুই দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই দুই দেশের সম্পর্ক যদি প্রকৃত অর্থেই ‘উইন-উইন’ ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে পুরো দক্ষিণ এশিয়া উপকৃত হবে। কিন্তু যদি কোনো চুক্তি এমন ধারণা সৃষ্টি করে যে একটি পক্ষ অধিক সুবিধা পাচ্ছে এবং অন্য পক্ষ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস বলে, শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তখনই দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়েছে, যখন তারা ছোট বা অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশীদারদের স্বার্থকেও গুরুত্ব দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাফল্যের পেছনে যেমন পারস্পরিক লাভের ধারণা কাজ করেছে, তেমনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ান জোটও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।

বাংলাদেশের জন্যও এ ঘটনা একটি শিক্ষা। ভবিষ্যতে যেকোনো বড় অবকাঠামো, জ্বালানি বা কৌশলগত বিনিয়োগ চুক্তির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাজারমূল্য, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, অর্থনৈতিক চুক্তির মূল ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। কারণ শেষ পর্যন্ত এসব চুক্তির আর্থিক বোঝা বহন করেন দেশের সাধারণ নাগরিকরাই।

একই সঙ্গে ভারতেরও উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর উপায় প্রভাব বিস্তার নয়, বরং আস্থা অর্জন। বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো যখন এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ হতে পারে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশ্বাস ও সমর্থন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহু ঐতিহাসিক ত্যাগ, সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি বিদ্যুৎ চুক্তি সেই সম্পর্কের চেয়ে অনেক ছোট বিষয়। তবে এই ছোট বিষয়ই কখনো কখনো বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তাই আদানি চুক্তি নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্ন কেবল কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বা কত ডলার ব্যয় হয়েছে, তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কি হবে ন্যায্য অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে, নাকি অসম অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর?

আজকের বিশ্বে কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রকৃত শক্তি সামরিক ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক আকারে নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা, ন্যায্যতা এবং সম্মানজনক সহযোগিতায় নিহিত। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য সেই সত্যটি যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে, ততই মঙ্গল হবে এ অঞ্চলের সকল দেশের জন্য।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন