হরমুজ প্রণালী বদলে দিতে পারে যুদ্ধের মোড়

হরমুজ প্রণালী বদলে দিতে পারে যুদ্ধের মোড়

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব অর্থনীতির স্পন্দন হরমুজ প্রণালী মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারণ, হরমুজ প্রণালী এমন এক সংকীর্ণ জলপথ, যার ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং এক-চতুর্থাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন। ফলে এখানে সংঘাত মানেই কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই বাস্তবতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ঘোষণা দিয়েছে—হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ আবারও কঠোরভাবে তাদের হাতে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপকে তারা “প্রতিরক্ষামূলক” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধের নামে “জলদস্যুতা ও সামুদ্রিক চুরি” চালিয়ে যাচ্ছে, এবং এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ইরানের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছিলেন—অবরোধ চলতে থাকলে এই প্রণালী খোলা থাকবে না। অর্থাৎ, একটি কৌশলগত বার্তা এখানে পরিষ্কার: ইরান শুধু প্রতিরোধ করছে না, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’কে সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত।

এই ঘোষণার পর থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে—যেখানে এটি আর কেবল একটি আন্তর্জাতিক জলপথ নয়, বরং একটি সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে সীমিত হয়ে এসেছে, বিমা খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে, এমনকি কোথাও কোথাও প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য অতিরিক্ত টোল দাবি করার কথাও শোনা যাচ্ছে। এর অর্থ, যুদ্ধ এখনো পূর্ণমাত্রায় শুরু না হলেও তার অর্থনৈতিক অভিঘাত ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান এই প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা পেয়েছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে কোণঠাসা করার নীতি প্রথম নজরে বাস্তববাদী মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই ধরনের কৌশল সবসময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। ইরাক কিংবা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—রাষ্ট্রের আচরণ কেবল অর্থনৈতিক যুক্তিতে নির্ধারিত হয় না; জাতীয়তাবোধ, নিরাপত্তা-মানসিকতা এবং ক্ষমতার কাঠামো সেখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইরানের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও দেশটি তার রাজনৈতিক কাঠামো টিকিয়ে রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারণা—অর্থনৈতিক সংকট মানেই দ্রুত আত্মসমর্পণ—একটি অতিসরলীকরণ। বরং এই পরিস্থিতিকে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে দেখলে ইরানের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে এই টানাপোড়েনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘মিউচুয়াল ইকোনমিক ড্যামেজ’। যদি ইরান এই প্রণালী কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে বা আংশিকভাবে বন্ধ করে দেয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা নয়—বরং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও। কারণ তাদের তেলও একই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। অর্থাৎ, এই অবরোধ একতরফা নয়; এটি পারস্পরিক ক্ষতির একটি জটিল সমীকরণ।

বিশ্ব অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গভীর। চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বৃহৎ অর্থনীতিগুলো তাদের জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটলে তাদের শিল্প, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রণালী শুধু অর্থনৈতিক নয়, নিরাপত্তাগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই দেশগুলো কি নীরব দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি তারা কূটনৈতিক বা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপের পথ খুঁজবে?

এখানে ‘চোক পয়েন্ট’ ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথে হলেও নিরাপদ চলাচলের কারণে তা কয়েকটি সংকীর্ণ পথের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ইতিহাসে দেখা গেছে, এসব পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারা মানে সমুদ্রশক্তিতে আধিপত্য বিস্তার করা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য জিব্রাল্টার, মাল্টা, এডেন ও সিঙ্গাপুর নিয়ন্ত্রণ করে বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও দারদানেলেস প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বর্তমান সময়েও একই বাস্তবতা ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহ—গ্রিনল্যান্ড বা পানামা খালের মতো এলাকায় প্রভাব বিস্তার—আসলে এই চোক পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। কারণ রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এই পথগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের একটি জটিলতা। সপ্তদশ শতাব্দীতে ডাচ আইনবিদ হুগো গ্রোটিয়াস ‘মুক্ত সমুদ্র’ ধারণা দেন, যেখানে সব দেশ সমানভাবে সমুদ্র ব্যবহার করতে পারে। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন এই ধারণাকে আরও সুসংহত করে। সেখানে ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ ও ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’—এই দুটি নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই চোক পয়েন্টগুলো এক বা একাধিক দেশের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে। হরমুজ প্রণালী ঠিক তেমনই একটি জায়গা, যা ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে। ইরান আন্তর্জাতিক এই নিয়মের কিছু অংশ মানলেও পূর্ণাঙ্গভাবে তা অনুমোদন দেয়নি। ফলে সংকটের সময় এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে চলে যায়।

এদিকে সামরিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও অনেক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরানের নৌবাহিনী আগের তুলনায় দুর্বল, তবু উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সমুদ্রের মাইন এই প্রণালীকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অর্থাৎ, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছাড়াই ইরান এই পথকে কার্যত অচল করে দিতে সক্ষম—যা তাদের জন্য একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ঝুঁকিও কম নয়। যদি তারা কোনো তেলবাহী জাহাজ আটক করে, বিশেষ করে চীন বা ভারতের মতো দেশের জাহাজ, তাহলে তা দ্রুতই বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় একতরফা অবরোধ আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়। অর্থনৈতিক অবরোধের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পড়ে না; এটি ধীরে ধীরে কার্যকর হয়। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেই তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতি বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ ইতোমধ্যেই সতর্ক করছেন—এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এটি সত্তরের দশকের পর সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটে রূপ নিতে পারে।

এই অবস্থায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—এই কৌশল সফল হলেও এরপর কী? যদি ইরান আলোচনায় ফিরে আসে, তবে সেই আলোচনার কাঠামো কী হবে? ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আঞ্চলিক প্রভাব, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—এসব জটিল ইস্যু সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ধৈর্য প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান নীতিতে সেই ধৈর্যের ঘাটতি স্পষ্ট।

পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়—এটি বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং শক্তির ভারসাম্যের এক জটিল প্রতীক। এখানে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেশের নয়, পুরো বিশ্বের ওপর প্রভাব ফেলে। ইরানের জন্য এটি শেষ বড় কৌশলগত হাতিয়ার, আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি প্রভাব বজায় রাখার পরীক্ষার মঞ্চ।
ফলে এই সংঘাত একপাক্ষিকভাবে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এটি দ্রুতই আঞ্চলিক উত্তেজনা থেকে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তেল ও গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ হলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, এশিয়া এবং ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোও গভীর সংকটে পড়বে।
এই বাস্তবতায়—হরমুজ প্রণালী সত্যিই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন