একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে তার জনগণের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের ওপর। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পায়। এই বাস্তবতায় একটি টেকসই ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঘোষিত নীতি, পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রতীয়মান হয় যে স্বাস্থ্যখাতকে আধুনিক, বিজ্ঞাননির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বার্তায় স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটানোর যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তিনি স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার ওপর গুরুত্ব আরোপ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানুষ, পশুপাখি ও পরিবেশ—এই তিনটির সুস্থতা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি কোনো একক সত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান ও পরিবেশবিজ্ঞানের সমন্বয়ে গবেষণা এবং টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গঠনের জন্য অপরিহার্য।
স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়নে প্রযুক্তির ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং (এমএল)-এর মতো প্রযুক্তি দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা সেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। বিশেষ করে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত ও বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। সরকারের ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতি এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রতিফলন। স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার—এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। এ লক্ষ্যে শহর ও গ্রাম উভয় পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্বারোপ একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
স্বাস্থ্যখাতে কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য। দেশব্যাপী ধাপে ধাপে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই উদ্যোগ গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণ, চিকিৎসা সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) চালুর পরিকল্পনা স্বাস্থ্যখাতকে আরও কার্যকর ও দক্ষ করে তুলবে।
স্বাস্থ্যবিমা চালু এবং ধীরে ধীরে এর বিস্তার সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা ব্যয় সহনীয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার করার পরিকল্পনা ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করবে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে সহায়ক হবে। সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার জন্য ন্যায়সঙ্গত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।
একটি টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই নীতির ভিত্তিতে রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে এবং স্বাস্থ্যখাতের ওপর চাপ হ্রাস পাবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক হবে।
সবশেষে, স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন গতি আনবে। তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সঠিক বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সরকারের ঘোষিত এই দূরদর্শী পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে একটি টেকসই, মানবিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, জবাবদিহিতা এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। একটি সুস্থ, সবল ও মানবিক জাতি গঠনের লক্ষ্যে এই উদ্যোগগুলো কেবল সময়োপযোগী নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ
এম রায়হানুল ইসলাম
মত-মতান্তর
১ মাস আগে
১৫ এপ্রিল (বুধবার), ২০২৬, ১০ঃ৫৯ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

জীবন
১ মাস আগেসবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ : ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা ক্রয় কেলেঙ্কারি ২০১৯ সালের একটি অত্যন্ত আলোচিত দুর্নীতি। এই ঘটনায় প্রতিটি পর্দা ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য সরঞ্জামে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে। এই অস্বাভাবিক দাম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের আদেশ দিয়েছে আদালত।মামলা: দুদক কর্তৃক ১০ কোটি টাকার অনিয়মের মামলায় ১২ আসামির বিরুদ্ধে মামলা।মামলার ফলাফল জানিনা!তারাই কিন্তু হসপিটাল চালাচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম আলোচিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু । তিনি স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিকে একটি "শিল্পে" পরিণত করেছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন । মিঠুর নাম স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির সমার্থক হয়ে উঠেছে এবং সরকার পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব অব্যাহত ছিল । তিনি বিভিন্ন সময় অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে গিয়েছেন।এই দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের কি উন্নতি করবেন!হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ডিগ্রির অংশ হিসেবে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল আছে।আমাদের আছে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।তাহলে আমাদের মেডিকেলের রান্না শিখতে সেখানে যেতে হবে কেন তারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এগুলো শিখতে আসবে!আপনারা কি স্বাস্থ্য খাতের পরিবর্তন করতে পারবেন।মনে করি শিক্ষার পরিবর্তন করা দরকার ঘরে বসে সবকিছু পাওয়া যায় দুনিয়ার প্লেনে করে যাওয়ার দরকার পড়ে না যদি কেউ যেতে চায় নিজ খরচে যাবে।