‘এগিয়ে যান, সবাই’- বুধবার হোয়াইট হাউসের বার্তা ছিল এমনই। ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে যে ৩৮ দিনের যুদ্ধ শুরু করেছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, তা মঙ্গলবার রাতের তড়িঘড়ি আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এই বিজয় ছিল ‘নির্ণায়ক’- এমনটাই দাবি করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি নিজেকে ‘যুদ্ধমন্ত্রী’ বলতে পছন্দ করেন। অন্যদিকে, ডনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল নেটওয়ার্কে লিখেছেন- মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি নতুন ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শনিবার পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় যোগ দিতে যাচ্ছেন। এ তথ্য জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাত শেষ করে অন্য কাজে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু তা সহজ হবে না।
ইরান যদিও দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, তবে তাদের দেয়া ১০ দফা প্রস্তাবে এমন অনেক বিস্ফোরক বিষয় রয়েছে, যা সহজেই আলোচনাকে ভেঙে দিতে পারে এবং আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সাফল্য নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত দুইটি দৃষ্টিভঙ্গি। হোয়াইট হাউসের মতে, ইরান সম্পূর্ণভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু ইসলামি বিপ্লবী গার্ড করপস (আইআরজিসি)-এর দৃষ্টিতে, তেহরান বিশ্ব পরাশক্তিকে অপমানজনকভাবে আঘাত করেছে। এই দুই অবস্থানের সত্যতা পুরোপুরি বুঝতে হয়তো সপ্তাহ, মাস বা বছর লেগে যাবে। তবে যুদ্ধের কুয়াশা কাটার আগেই কিছু প্রাথমিক মূল্যায়ন করা সম্ভব।
হত্যাকাণ্ড
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। সঙ্গে নিহত হন তার স্ত্রী, পুত্রবধূ ও নাতিও। এই অভিযানে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভয়াবহ অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়। যার মধ্যে সারা দেশের ট্রাফিক ক্যামেরার অ্যাক্সেসও ছিল। এরপরের সপ্তাহগুলোতে ইসরাইল দাবি করেছে তারা প্রায় ২৫০ জন ইরানি শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে আলি লারিজানি এবং শীর্ষ গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারাও ছিলেন। আলি লারিজানিকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান বলা হতো। তবুও, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। কঠোরপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে আছে। এর মধ্যে রয়েছেন নিহত সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মুজতবা খামেনি। তাকে তার উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী এই নেতা ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে আর জনসমক্ষে আসেননি। এমনকি কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি অচেতন অবস্থায় আছেন এবং কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার অবস্থায় নেই। তবে, ইরান সহজেই এই ক্ষতি সামলে নিতে পারবে- এমন ধারণা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি এই যুদ্ধ দেশটিকে নতুন বাস্তববাদী পথে নিয়ে গেছে- এমন ধারণাও ভুল।
বিমান অভিযান
প্রায় ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ১৩০০০টির বেশি হামলা চালিয়েছে। যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের মতে, এতে ধ্বংস হয়েছে ইরানের ৮০ ভাগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ৪৫০টি ড্রোন সংরক্ষণাগার, ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও ১৫০টি জাহাজ। কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দেশটির বড় অংশে আকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তুলনামূলক কম ক্ষতির বিনিময়ে।
হ্যাঁ, কুয়েত থেকে ভুলবশত ছোড়া গুলিতে তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আরেকটি বিমান ভূপাতিত করলে বিশেষ বাহিনী অভিযানে গিয়ে দুই পাইলটকে উদ্ধার করে। সেখানে ব্যবহার করা হয় বিশেষ হেলিকপ্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর হার্টবিট শনাক্তকারী প্রযুক্তি।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মাসে বলেন, যুদ্ধের মূল কারণ ছিল ইরানকে থামানো। কয়েক বছরের মধ্যে তারা এত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর হামলা সম্ভব হতো না।
তবে বাস্তব চিত্র মিশ্র।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৮০ ভাগ কমে যায়। কিন্তু পরে তারা প্রতিদিন গড়ে ৬০টি ড্রোন ও ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে থাকে। সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের এখনো যুদ্ধপূর্ব অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৫০ ভাগ রয়েছে। শান্তির জন্য ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে হবে এবং শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করার অঙ্গীকার করতে হবে। তবে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। অন্যদিকে, আইআরজিসি দাবি করছে তারা সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ১০০ বারের বেশি হামলা চালিয়েছে। ফলে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিতে হয়েছে। এই সংঘাতে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র প্রকাশ না করতে স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোকে ছবি প্রকাশ বন্ধ করতে বলা হয়েছিল। একই সময়ে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলা বড় চাপ সৃষ্টি করে। সম্ভবত ‘পারস্পরিক ধ্বংসের আশঙ্কাই’ ট্রাম্পকে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি বাস্তবায়ন থেকে বিরত রেখেছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি
ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সফলতার দাবি ‘স্পষ্টতই হাস্যকর’। বুধবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ফার্সি ভাষার বিবৃতিতে এর কোনো উল্লেখ নেই। বরং তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মেনে নিয়েছে। সম্ভবত ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনায় কোনো সমঝোতা হতে পারে। তবে ইরান নিজেদের সামরিক সাফল্যে আত্মবিশ্বাসী হওয়ায়, তারা যুদ্ধের আগের চুক্তির চেয়েও বেশি ছাড় দেবে- এমন সম্ভাবনা কম।
সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ
যুদ্ধের আগে ইরানের নৌবাহিনী খুব শক্তিশালী ছিল না। এখন তাদের ৯০ ভাগ বড় জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। তবুও সমস্যা হলো- হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে ইরানের খুব বেশি কিছু লাগে না। কয়েকটি মাইন, ছোট নৌযান এবং ড্রোন দিয়েই তারা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ রাখতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রণালি খুলতে পারেনি।
তেহরানের ‘টোল বুথ’
ইরান তাদের কৌশলগত বিজয়ের মূল হিসেবে দেখছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ট্যাঙ্কার চলাচল সম্পূর্ণ, অবিলম্বে ও নিরাপদভাবে চালু হবে। কিন্তু ইরান বলেছে- যেকোনো জাহাজ চলাচলের জন্য তাদের সামরিক বাহিনীর অনুমতি লাগবে এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর অর্থ হতে পারে- ইরান জাহাজ থেকে টোল নেয়া চালিয়ে যাবে। এমনকি ট্রাম্প নিজেও প্রস্তাব দেন- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে এই টোল ব্যবস্থা চালাতে পারে। এই বিভ্রান্তির মধ্যে শত শত তেলবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে থাকে।
উপসাগরীয় প্রতিক্রিয়া
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নির্ভর করেছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা- দুই দিকেই আঘাত করেছে। দুবাইয়ের মতো শহর, যা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত ছিল, তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন। সে সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াও এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে।
ইসরাইল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে
যুদ্ধের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলকে নিয়ে সন্দেহ বাড়ছিল। অনেকে মনে করছেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধ শুরু করতে প্রভাবিত করেছিলেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি হোয়াইট হাউসে বলেছিলেন- এই হামলায় সহজেই ইরানের সরকার পরিবর্তন সম্ভব হবে। ট্রাম্প নাকি জবাব দিয়েছিলেন- ‘ভালো শোনাচ্ছে।’
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইল লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ইরান বলছে যুদ্ধবিরতি মানে তাদের মিত্রদের ওপর হামলাও বন্ধ হতে হবে। সর্বশেষ বুধবার লেবাননে ১০ মিনিটে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে ইসরাইল। এর প্রতিবাদে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
দেশীয় অর্থনীতি
যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ছিল প্রতি গ্যালন ৩.২০ ডলার। এখন তা ৪ ডলারের বেশি, ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু জায়গায় ৮-৯ ডলার পর্যন্ত। এটাই হয়তো ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধ মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে, ঋণের সুদ বাড়িয়ে রাখতে পারে এবং বিমান ভ্রমণ ব্যয়বহুল করতে পারে। ফক্স নিউজের জরিপে ৫৮ ভাগ মানুষ বলেছেন এই যুদ্ধ তাদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যুদ্ধবিরতি হলেও সমস্যা শেষ হয়নি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু হতে সময় লাগবে। ট্রাম্প হয়তো এই অধ্যায় শেষ করতে চান। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো সহজে শেষ হয় না- এটাই বলে ইতিহাস।
(লেখক টেলিগ্রাফের সিনিয়র ফরেন করেসপন্ডেন্ট)
