জনসংখ্যা ১ কোটিতে আটকে রাখার পরিকল্পনা করছে সুইজারল্যান্ড। এই লক্ষ্যে তারা বিরল এক গণভোটের আয়োজন করবে বলেও জানিয়েছেন। তবে কোন দেশ কি তার জনসংখ্যা নির্দিষ্ট কোন সীমায় আটকে রাখতে পারে কিনা এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রোববার এই প্রস্তাবের উপর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই বিশ্বে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এই সিদ্ধান্ত। সুইজারল্যান্ডের ডানপন্থী দল সুইস পিপলস পার্টি এই প্রস্তাবের পক্ষ নেন। তারা একে স্থায়ীত্ব অর্জনের পদক্ষেপ বলে অবহিত করেছেন।
এর মাধ্যমে বাসাবাড়ি ভাড়া, সরকারি সেবা এবং পরিবেশ সুরক্ষা ইত্যাদি আরো সহজ হবে বলে জানিয়েছে তারা। তবে এর বিরোধিতা করেছে সুইস সরকার এবং অন্য অন্য প্রধান দলগুলো। তারা একে গোলমেলে প্রস্তাব বলে অবহিত করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে এতে সুইজারল্যান্ড বিপাকে পড়তে পারে এবং হসপিটাল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরির জন্য লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও সুইজারল্যান্ডের মাঝে গড়ে ওঠা সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ২০০২ সাল থেকে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সেসময় দেশটিতে জনসংখ্যা ছিলো ৭৩ লাখ। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৯১ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এর ভেতর শতকরা ২৭ ভাগ হলো বিদেশি নাগরিক। জনসংখ্যার বৃদ্ধিতে স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সুইস নিবাসীদের। ট্রেনগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, আবাসন সংকট এবং স্বাস্থ্য সেবার ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১ কোটির (১০ মিলিয়ন) মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেই গণভোটের আয়োজন করবে সুইজারল্যান্ড। তবে সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, এ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চরম বিভাজন দেখা যাচ্ছে। যেখানে ৫২ ভাগ ভোটার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে এবং ৪৫ ভাগ পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। গণভোটকে কেন্দ্র করে সুইজারল্যান্ডের রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অভিবাসী পরিবার থেকে আসা দুই তরুণ রাজনীতিবিদের দ্বিমুখী অবস্থানে। সুইজ পিপলস পার্টির ২৯ বছর বয়সী সংসদ সদস্য নিলস ফিশটার মনে করেন, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের কারণে সুইজারল্যান্ড তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। আবাসন সংকট, যানজট এবং স্কুলের ওপর অতিরিক্ত চাপের জন্য তিনি অভিবাসনকেই দায়ী করছেন। অন্যদিকে, ৩১ বছর বয়সী সোশ্যাল ডেমোক্রেট কাউন্সিলর হেলিন জেনিস এই যুক্তিকে স্রেফ বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি বা স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বাড়ার পেছনে অভিবাসীরা দায়ী নয়, বরং আবাসন ও অবকাঠামো খাতে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবই এর আসল কারণ। ভোটারদের বড় একটি অংশের প্রশ্ন হলো, এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইনটি ঠিক কীভাবে কাজ করবে? প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের আগে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা কোনোভাবেই ১ কোটি অতিক্রম করতে পারবে না এবং জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছামাত্রই সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে পারে রাজনৈতিক আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) দেওয়ার সংখ্যা সীমিত করা এবং বিদেশি কর্মীদের পরিবার নিয়ে আসার অধিকার বাতিল করা। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো, জনসংখ্যা ১ কোটির সীমা ছুঁলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউ) সঙ্গে মুক্ত চলাচল চুক্তি সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল করতে হবে। সুইজারল্যান্ডের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন ‘ইকোনমি সুইস’-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিনশ সতর্ক করেছেন যে, এটি হলে প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ইইউ-এর সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের স্থিতিশীল সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরবে।
ব্রাসেলস আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো দেশ ইইউ-এর একক বাজারের সুবিধা নেবে অথচ মুক্ত চলাচলের প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যাবে এমনটি মেনে নেওয়া হবে না। সুইজারল্যান্ডের হোটেল ব্যবসার অর্ধেক কর্মীই অভিবাসী। এছাড়া হাসপাতাল ও কেয়ার হোমগুলোও পুরোপুরি বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। দেশের ২০ ভাগ মানুষের বয়স এখন ৬৫ বছরের বেশি। বিরোধীদের মতে, এই বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সেবা ও করের জোগান দিতে তরুণ কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন, যা সুইজারল্যান্ড নিজে তৈরি করতে পারছে না। এর ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সুইস পণ্যের ওপর ৩৯ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করায় চরম ধাক্কা খেয়েছে দেশটির অর্থনীতি, যা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার চুক্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
