বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উন্মাদনা ও সংঘর্ষের নেপথ্য কারণ

ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উন্মাদনা ও সংঘর্ষের নেপথ্য কারণ

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বজুড়ে ফুটবল বিশ্বকাপের মহারণ শুরু হতেই দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট পাগল দেশ বাংলাদেশে নেমে এসেছে অভূতপূর্ব ফুটবল উন্মাদনা। বাংলাদেশ কখনো ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও, ল্যাটিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি এ দেশের মানুষের উন্মাদনা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সমর্থকদের অনায়াসেই টেক্কা দিতে পারে। তবে এই ভালোবাসার আবহ মাঝে মাঝেই রূপ নিচ্ছে সহিংসতায়, যার জেরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ছে দুই দলের সমর্থকরা।

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাস থেকেই ঢাকার গুলশানের মতো অভিজাত এলাকার স্পোর্টস মার্কেটগুলোতে মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার জার্সি কেনার ধুম লেগেছে। পাড়া-মহল্লায় ঝুলছে দুই দেশের বিশালাকার পতাকা, আর রাস্তায় শোভা পাচ্ছে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র সহ বিভিন্ন খেলোয়ারের বিশালাকার কাট-আউট। তবে এই আবেগ শুধু উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সম্প্রতি হবিগঞ্জে স্থানীয় একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

এমনকি শরীয়তপুরের কয়েকজন তরুণ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০০২ সালের পর দীর্ঘ খরায় থাকা ব্রাজিল যতদিন না আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি জিতছে, ততদিন তারা বিয়েই করবেন না! ল্যাটিন আমেরিকার এই দুই দেশ ছাড়াও অন্যান্য দলের প্রতিও বাংলাদেশিদের খামখেয়ালি ভালোবাসা দেখা যাচ্ছে।বাংলাদেশের এক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়, আমজাদ হোসেন নামের ৭২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নিজের জমির অংশ বিক্রি করে জার্মানির সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এক পতাকা তৈরি করে গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন। যার স্বপ্ন এই পতাকাটি যেন জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থান পায়। অন্যদিকে, দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া নরওয়ের দূতাবাসও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছে সমর্থন চেয়ে পোস্ট করেছে।

বাংলাদেশিদের এই উন্মাদনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দুটি দেশের প্রতি এই অন্ধ ভালোবাসার পেছনে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ। ১৯ শতকে বৃটিশ উপনিবেশের হাত ধরে এই অঞ্চলে ফুটবলের আগমন ঘটে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল, তখন এ দেশের তরুণ সমাজ ফুটবলের জাদুকর পেলের ব্রাজিলের মধ্যে এক ধরনের অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশনের বিস্তার ঘটে। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে বিশ্বজুড়ে যে ম্যারাডোনা-উন্মাদনা তৈরি হয়, তা বাংলাদেশিদের গভীরভাবে স্পর্শ করে। বিশেষ করে সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক গোল এবং জয়কে এ দেশের মানুষ বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী বিজয় হিসেবে উদযাপন করেছিল। সেই ম্যারাডোনার শূন্যতা এখন পূরণ করেছেন লিওনেল মেসি, আর ব্রাজিলের সমর্থকদের আশার আলো হয়ে আছেন নেইমার।

উন্মাদনার অন্ধকার দিক: ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে এই ফুটবল দ্বৈরথের অন্ধকার দিক। বেশ কয়েকবার উভয় দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় দুই দলের সমর্থকদের সংঘর্ষে বাংলাদেশে অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন। এর আগে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে উঁচুতে পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক কিশোরসহ বেশ কয়েকজন ভক্তের মৃত্যু হয়েছিল। এবারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা জুড়ে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ যখন শুরু হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার পারদ আবারও তুঙ্গে উঠেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন