প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘ যে যুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘ যে যুদ্ধ

ফন্ট সাইজ:

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এক অনিশ্চিত ও অভূতপূর্ব পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী ইউক্রেনে প্রবেশ করার চার বছরেরও বেশি সময় পর এই সংঘাত এখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলে। সেই যুদ্ধ ‘গ্রেট ওয়ার’ নামে পরিচিত। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের মতে, এই যুদ্ধ এখন ১,৫৬৯ দিন অতিক্রম করেছে। যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মেয়াদকালের চেয়েও বেশি। শুরুতে এটি ছিল এমন একটি সামরিক অভিযান, যেখানে ক্রেমলিন ধারণা করেছিল যে কয়েক দিনের মধ্যেই কিয়েভের পতন হবে। কিন্তু বাস্তবে এটি ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পরিণত হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো এটি বহু মহাশক্তিকে নিয়ে একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ নয়; বরং এটি মূলত দুটি দেশের সংঘাত। তবুও আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার- ড্রোন, নিখুঁতভাবে নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এটিকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এই প্রযুক্তিই ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভলোদিমির জেলেনস্কির যুদ্ধ কৌশলকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে।

২০২২ সালে মস্কো দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিল। কিন্তু সেই আক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে রূপ নেয়, যা ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে বদলে দিয়েছে এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রায় সব পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করেছে। এ পর্যন্ত মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর বহু চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই স্থায়ী শান্তির পথে অগ্রসর হতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডার-ইন-চিফ ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বজুড়ে বড় বড় সংঘাতের সমাধান করতে সক্ষম একজন ‘ডিলমেকার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তিনিও মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছেন।

তবে ইউক্রেন সংকট তার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়। সংঘাতের একটি আলোচিত কূটনৈতিক মুহূর্তে ট্রাম্প আলাস্কায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেন এবং এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আতিথেয়তা দেন। সেখানে করমর্দন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, যৌথ উপস্থিতি এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে খুব সামান্যই পরিবর্তন আসে। পুতিন মস্কোতে ফিরে যান, আর যুদ্ধযন্ত্র আগের মতোই চলতে থাকে।

অন্যদিকে জেলেনস্কি বিভিন্ন রাজধানীতে ঘুরে সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা চালিয়ে যান। পশ্চিমা সামরিক ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ইউক্রেনীয় নেতা বারবার ওয়াশিংটন সফর করেন। তবে এসব সফরে কখনো কখনো তার যুদ্ধকালীন পোশাক নিয়েই বেশি আলোচনা হয়, যা কূটনীতির চেয়ে প্রতীকী রাজনীতির প্রাধান্যকে তুলে ধরে।

পুতিনের জুয়া, জেলেনস্কির প্রতিরোধ
ভ্লাদিমির পুতিন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রুশ রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন এবং সাবেক কৌতুকাভিনেতা থেকে যুদ্ধকালীন প্রতিরোধের মুখ হয়ে ওঠা ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে এই যুদ্ধ প্রাথমিক প্রত্যাশার অনেক বেশি সময় ধরে চলছে। অল্পই কেউ ধারণা করেছিল যে ন্যাটোর বাইরে থাকা এবং পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন ইউক্রেন এত দীর্ঘ সময় রাশিয়ার সামরিক শক্তিকে প্রতিরোধ করতে পারবে। একইভাবে ক্রেমলিনও সম্ভবত ধারণা করেনি যে কয়েক দিনের বা সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকা অভিযান চার বছরের বেশি সময় ধরে চলবে। রাশিয়া ইউক্রেনকে নিজের প্রভাব বলয়ের মধ্যে আনতে আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু ইউক্রেনের প্রতিরোধ, পশ্চিমা সামরিক ও আর্থিক সহায়তায় শক্তিশালী হয়ে, এই যুদ্ধকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘ওয়ার অব অ্যাট্রিশন’-এ পরিণত করেছে- যেখানে প্রাণ, সম্পদ এবং রাজনৈতিক শক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষয় হচ্ছে।

একজন ইউক্রেনীয় সৈন্য, যার ডাকনাম শুধু ‘ফ্রান্স’ হিসেবে পরিচিত, তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম হয়তো দুই বা তিন বছরের মধ্যে রাজনীতিবিদরা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবে।
কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ এখনো চলমান এবং এর কোনো পরিষ্কার সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিধ্বনি
বছরের পর বছর ধরে বিশ্লেষকরা ইউক্রেন যুদ্ধকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে আসছেন। এর মিলগুলো স্পষ্ট- খন্দকের যুদ্ধ, ভয়াবহ পদাতিক আক্রমণ, বিপুল প্রাণহানি এবং ধীরে ধীরে সীমিত ভূখণ্ড দখলের লড়াই। দ্য ইকোনমিস্ট এই বার্ষিকীকে ‘বিষণ্ন মাইলফলক’ বলে উল্লেখ করেছে এবং স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ১৯১৪ সালে অনেকেই ভেবেছিল যুদ্ধ ‘ক্রিসমাসের আগেই শেষ হবে’- যা বাস্তবে হয়নি। তখন যেমন দ্রুত বিজয়ের আশা করা হয়েছিল, আজও তেমনই ভুল অনুমান দেখা গেছে। এক শতাব্দী আগে মেশিনগান, ট্যাংক ও বিষাক্ত গ্যাস যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিয়েছিল; আর আজ ড্রোন, নির্ভুল হামলা এবং ডিজিটাল নজরদারি যুদ্ধকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন