গালফ অঞ্চলের ট্রিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ তহবিলগুলো এখন তাদের দীর্ঘদিনের পশ্চিমমুখী বিনিয়োগ কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে, আর এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক বিরল অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্ত, এটি এমন একটি সুযোগ, যা আমাদের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির গতিপথ আমূল বদলে দিতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে গালফের এই তহবিলগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শেয়ারবাজার, ট্রেজারি বন্ড এবং প্রাইভেট ইকুইটিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং উদীয়মান বাজারে তুলনামূলক বেশি মুনাফার কারণে সেই ধারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন বৈশ্বিক মূলধনের নতুন মানচিত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কেন্দ্রীয় অবস্থান দখল করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গালফ সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর তহবিল ২০২৫ সালে রেকর্ড ১২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে বিনিয়োগের পরিমাণে নয়, বরং এর গন্তব্যে। এশিয়া এখন তাদের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত পশ্চিমা সম্পৃক্ততার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ জব্দের মতো ঘটনা দেখিয়েছে যে, ভূরাজনীতির কারণে সম্পদও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তৃতীয়ত, উদীয়মান বাজারগুলো এখন ধারাবাহিকভাবে বেশি রিটার্ন দিচ্ছে। ফলে গালফের বিনিয়োগকারীরা নতুন বাজারের দিকে ঝুঁকছে।
এশিয়ায় বিনিয়োগ প্রবাহ ইতোমধ্যেই দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে এই অঞ্চলে গালফ তহবিলের বিনিয়োগ ৩৩.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে চীন বড় অংশ দখল করেছে, পাশাপাশি ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তানও প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সুযোগটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং গালফ অঞ্চলে বিপুল প্রবাসী শ্রমশক্তি—সব মিলিয়ে একটি স্বাভাবিক বিনিয়োগ সেতু তৈরি করেছে। এছাড়া পোশাক, ওষুধ, সবুজ শিল্প এবং ডিজিটাল খাত ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। দেশটি যেখানে জ্বালানির বড় অংশ আমদানিনির্ভর, সেখানে অফশোর গ্যাস, এলএনজি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বিদ্যুৎ খাতে গালফ বিনিয়োগ সরাসরি কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি মাতারবাড়ি কেন্দ্রিক শিল্প করিডর, পেট্রোকেমিক্যাল, হালাল খাদ্য এবং ইসলামিক ফাইন্যান্স খাত বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আসছে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। একক বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ গঠন, গালফভিত্তিক শিল্প অঞ্চল তৈরি, সার্বভৌম সবুজ সুকুক চালু, ইসলামিক ফাইন্যান্স আইনি কাঠামো প্রণয়ন এবং হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ—এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আর এই তহবিলের মোট বিনিয়োগের মাত্র ২ শতাংশ বাংলাদেশে এলে দেশের বার্ষিক বৈদেশিক বিনিয়োগ দ্বিগুণ হতে পারে। আর ৫ শতাংশ এলে তা অর্থনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সামনে এখন তিন থেকে পাঁচ বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অবস্থান করছে। এই সময়ের মধ্যে সঠিক নীতি ও কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে দেশটি বৈশ্বিক বিনিয়োগ মানচিত্রে নতুন গেমচেঞ্জার অবস্থান তৈরি করতে পারে —তা না হলে এই সুযোগ অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাতো রয়েছেই।
লেখক: সিনিয়র অধ্যাপক, (অর্থায়ন ও বিনিয়োগ), কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।
সাবেক পরিচালক, আইসিসিআই, জেদ্দা।
[email protected]
ভাষান্তর: আরিফুল ইসলাম, মালয়েশিয়া
ট্রিলিয়ন ডলারের গালফ তহবিলের হাতছানি
দেশের জন্য হতে পারে অর্থনীতির মিরাকল টার্নিং পয়েন্ট
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
৬ এপ্রিল (সোমবার), ২০২৬, ১ঃ১৭ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

Nameer
২ মাস আগেIt's a great opportunity for Bangladesh economy.