“যুদ্ধ শুরু করা সহজ, শেষ করা কঠিন”। এই পুরনো সত্যটি যেন নতুন করে সামনে এসেছে ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতির প্রেক্ষাপটে। দ্রুত সিদ্ধান্ত, শক্তি প্রদর্শনের কৌশল এবং ‘চাপ দিয়ে ফল আদায়’-এর রাজনীতি সব মিলিয়ে যে সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাশিত ফল তো আনেইনি, বরং নতুন করে এক অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশকে সরিয়ে দেয়া হয়। ওয়াশিংটন ভেবেছিল, এতে ইরানের ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়বে এবং হয়তো শাসন পরিবর্তনের পথ খুলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সম্পূর্ণ উল্টো। ক্ষমতা আরও শক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে কঠোরপন্থী বিপ্লবী গার্ডের হাতে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হয়েছে।
এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের বড় ভুল ইরানের সক্ষমতা ও প্রস্তুতিকে অবমূল্যায়ন। বহু বছর ধরেই তেহরান সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের সামরিক কৌশল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা, বিকেন্দ্রীকৃত এবং প্রতিরোধ-নির্ভর। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত এলেও পাল্টা জবাব দেয়ার ক্ষমতা তারা হারায়নি।
আরও বড় ভুল ছিল কৌশলগত অস্পষ্টতা। বারবার সময়সীমা নির্ধারণ করে তা পেছানো, পরিষ্কার লক্ষ্য না থাকা এসবই দেখায় যে সিদ্ধান্তগুলো ছিল বেশি তাৎক্ষণিক, কম পরিকল্পিত। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা এবং বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে না বোঝার ফল এখন স্পষ্ট।
এই ভুলের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালী যেখানে দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল সরবরাহ হয় তা যদি অচল হয়ে যায়, তাহলে এর ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি তীব্র হবে, এমনকি খাদ্য সংকটও তৈরি হতে পারে, কারণ সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়বে।
ইরান ইতোমধ্যে গালফ অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে। এর ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে ইরানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। শিয়া মতাদর্শে আত্মত্যাগ বা শহীদ হওয়ার ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত। ইতিহাসও বলে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। ইরান-ইরাক যুদ্ধ আট বছর স্থায়ী হয়েছিল এটি কোনো ছোট উদাহরণ নয়।
এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো সংঘাতের বিস্তার ও দীর্ঘায়ন। যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে স্থলসেনা পাঠানোর আলোচনা চলছে, যা সমর্থন করছেন লিন্ডসে গ্রাহাম-এর মতো নেতারা। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এর প্রভাব কম নয়। ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকরাই চান, তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় মনোযোগ দিন। বিদেশে নতুন যুদ্ধের বোঝা তার জন্য নির্বাচনী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত সমাধান আনার যে চেষ্টা, তা ব্যর্থ হয়েছে। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এখন একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ কূটনীতি। কারণ যুদ্ধের শুরু হয়তো ইচ্ছায়, কিন্তু তার শেষ নির্ধারণ করে বাস্তবতা।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
