টানা দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ‘আত্মরক্ষামূলক অতিরিক্ত হামলা’ চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইরানকে কঠোরভাবে আঘাত করার হুঁশিয়ারি দেয়ার পরপরই এসব হামলা চালানো হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। একই সঙ্গে পশ্চিম তেহরান, ফার্স প্রদেশ, বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ, কিশ দ্বীপ, মিনাব এবং মধ্য ইসফাহানের কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এতে দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই নড়বড়ে হয়ে থাকা যুদ্ধবিরতি আরও চাপের মুখে পড়েছে। এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা সর্বশেষ মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হেনেছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ আইআরজিসির এক বিবৃতি উদ্ধৃত বলেছে, দুই দফা অভিযানে আলি ও আহমাদ আহমাদ বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তারা শেখ ইসা বিমানঘাঁটিও ধ্বংস করেছে। এর আগে ইরানি গণমাধ্যম জানায়, বাহরাইনে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরেও হামলা চালিয়েছে ইরান। এ ছাড়া আইআরজিসি এক বিবৃতিতে দাবি করে, বৈশ্বিক তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি তারা সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে আইআরজিসি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অবিলম্বে কার্যকর হরমুজ প্রণালি তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ সব ধরনের নৌযানের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্কিন সেন্টকম জানায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধের ইরানি দাবি সঠিক নয়। তারা আইআরজিসির বিবৃতিকে খণ্ডন করে জানায়, নতুন করে সংঘাত শুরু হলেও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বুধবার দিবাগত রাতেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করছিল।
ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেহরান যদি মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর না করে, তাহলে মার্কিন বাহিনী বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতেও বোমা হামলা চালাবে। এ সময় তিনি একটি অশালীন শব্দও ব্যবহার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ৪৯টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এর কিছু তেহরান থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে আঘাত হেনেছে। ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প দাবি করেছেন মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোও ইরানের আকাশে অভিযান চালাচ্ছে এবং পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে ফোন করে যুক্তরাষ্ট্রকে বোমা হামলা বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে পাল্টা জবাব দেবে। তিনি বলেন, আপনারা যদি হরমুজ প্রণালিকে অনিরাপদ করে তোলেন, তাহলে ইরানের সর্বত্র থেকে আমরা এই অঞ্চলকে আপনাদের জন্য নরকে পরিণত করব।
অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাতে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী তার সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের কোনো সরাসরি টেলিফোন আলাপ হয়নি। দুই পক্ষের মধ্যে এমন কোনো যোগাযোগ হয়নি বলেও তারা দাবি করেছে। আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি করার পর বাহরাইনের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনগণকে শান্ত থাকার এবং নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
কুয়েতে সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, গৃহীত সামরিক কার্যপ্রণালি অনুযায়ী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের আকাশযান লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করছে। তারা নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জারি করা নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার এবং অনুমোদিত সরকারি সূত্র থেকে তথ্য নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন হামলার দ্বিতীয় দিনের এই অভিযান এমন এক সময়ে ঘটল, যখন কয়েক ঘণ্টা আগেই বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডান- যেসব দেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, সেগুলো ইরানের হামলার মুখে পড়ে।
