জুলাই সনদ ইস্যুতে বিরোধী দলের ওয়াকআউট

শিগগিরই সংবিধান সংশোধন কমিটি

জুলাই সনদ ইস্যুতে বিরোধী দলের ওয়াকআউট

ফন্ট সাইজ:

জুলাই সনদ ইস্যুতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল জামায়াত জোটের এমপিরা। গণভোট ও সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব এবং পরিষদ গঠন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন তারা। অধিবেশন চলাকালে প্রতিবাদস্বরূপ সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন বিরোধীদলীয় এমপিরা। বুধবার বিকালে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের প্রশ্নে সংসদে আলোচনা হলেও তা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে কক্ষ ত্যাগ করেন তারা। ওদিকে সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নিতে ১৫ থেকে ২০ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি শিগগিরই গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের সংস্কার প্রস্তাব এবং পরিষদ গঠন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা উচিত। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এবং সংকট নিরসনে এই কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানান, বিরোধী দলের প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার নজির খুব কম থাকলেও বর্তমান অধিবেশনে আলোচনার স্বার্থে তা গ্রহণ করা হয়েছে। স্পিকার আরও বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে আলোচনার অবারিত সুযোগ রয়েছে এবং আগামীতেও এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ দেয়া হবে।

তবে স্পিকারের এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিরোধী দল। বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, তাদের মূল নোটিশকে ধামাচাপা দিতে অন্য একটি নোটিশ সামনে আনা হয়েছে। তিনি একে জনগণের রায়ের অবমূল্যায়ন এবং সংসদীয় রীতির লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন। এই অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের সকল এমপিদের নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করার ঘোষণা দেন তিনি।

ওয়াকআউটের সময় স্পিকার বলেন, সংসদীয় রীতি অনুযায়ী বিরোধী দলের ওয়াকআউট করার অধিকার রয়েছে। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় সংস্কৃতিতে ওয়াকআউট একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে আলোচনার মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই সংসদের পরবর্তী কার্যক্রম চলমান থাকে।

সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব এবং সংবিধান পরিষদ গঠন সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় ওয়াকআউটের কথা বলেন। পরে পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ওয়াকআউট করতে চেয়েছেন, পার্লামেন্টের কালচারে সেটা আছে, রাইট আছে তারা ওয়াকআউট করতে পারেন। তবে যে কথাগুলো রেকর্ডে হয়ে গেল, তার বিপরীতে আমাদের বক্তব্যটা এক-দুই মিনিট রেকর্ডে থাকা ভালো। যে মুলতবি প্রস্তাবটা আপনার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার প্রিসাইড করেছেন, উনি গ্রহণ করেছিলেন। তখনই আমি আপত্তি উত্থাপন করেছিলাম, যেটা ৬৮ বিধিতে হতে পারে। কিন্তু মূলত প্রস্তাব, যে রুলস অফ প্রসেস আছে, তার মধ্যে আপনি রাইটলি আইডেন্টিফাইড করেছেন- সেটা আমি আগে উত্থাপন করেছি। যে বিষয়টি আইনপ্রণয়নের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে, সেরকম কোনো বিষয় মুলতবি প্রস্তাবে আলোচনা করার বিধান নাই। এটা আপনাদের উদারতা, হাউজের অভিভাবক হিসেবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে। আপনি আলোচনার জন্য রেখেছেন এবং সেটা দু’ঘণ্টা আলোচনার জন্য সময় নির্ধারিত হয়েছে। পক্ষে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এটা যেহেতু বিধি বহির্ভূত এবং আলাপ-আলোচনা হয়ে যাওয়ার পরে পার্লামেন্টের প্র্যাকটিস হচ্ছে ইটস টক আউট আলোচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, আলোচনার পরে নিষ্পত্তি কি হবে, সেজন্য ভোটাভুটি দেয়ার কোনো বিধান নাই। শুধুমাত্র মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপিত হবে কিনা, উত্থাপিত হবে অথবা হবে না তার উপরে ভোটাভুটির বিধান আছে। কিন্তু আপনি যদি তখন ভোটাভুটি বিধান দিতেন, তাহলে এই আলোচনা প্রস্তাব উত্থাপিতই হতো না। অথবা আরেকটা আপনার অপশন আছে, স্পিকার হিসেবে আপনি কোনো মুলতবি প্রস্তাব বিবেচনা করবেন অথবা বিবেচনা করবেন না- আপনি এটা রিড আউট করেন। এটা প্রিভিলেজ হলো অপজিশন মেম্বার কেউ যখন সরকারি কর্ম বাধাগ্রস্ত করতে চায়, বৃটিশ পার্লামেন্টের নজির অনুসারে তারা ট্রেজারি বেঞ্চের আলোচনা যাতে এগিয়ে না যায়- সেজন্য মুলতবি প্রস্তাব তোলে। তোলার পরে সেটা মুলতবি হলো কি হলো না, সেটা স্পিকারের এখতিয়ার অথবা ভোটাভুটির এখতিয়ার। তখন মুলতবি প্রস্তাবটা আলোচনা না হলেও প্রিভিলেজটা হলো যে তাদের উত্থাপিত বিষয়টা আপনাকে পড়তে হয় সেটাই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা কোনো মুলতবি প্রস্তাব এখানে রিড আউট করি নাই। উনি (বিরোধী দলের নেতা) যেটা বলেছেন, সেটা অসত্য বলেছেন, যেটা মুলতবি প্রস্তাব আমিও শুনেছি- আজকে একজন বেসরকারি সদস্য উত্থাপন করতে পারেন। সেটা আপনাকে বিবেচনা করতে হবে। যেহেতু একই বিষয়ে আপনি বিরোধী দলের নেতার একই রকম মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। এজ এ ম্যাটার অফ রাইট বেসরকারি সদস্য সেটা ক্লেইম করতে পারে।
অন্যদিকে গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ কমিটির তৃতীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকারি দল, বিরোধী দল, অন্যান্য দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদেরও কমিটিতে রাখার চিন্তা আছে। এ বিষয়ে তার দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী, আগামী রোববারের মধ্যেই কমিটি গঠনের অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য একটা কমিটি হবে। সেখানে সব দলের প্রতিনিধি রাখতে চাই আনুপাতিক হারে। স্বতন্ত্র থেকেও আমরা রাখতে চাই। সকলের মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি কমিটি অচিরেই করবো। আগামী রোববারের মধ্যে আপনারা দেখবেন হয়তো- খুব শিগগিরই এটা করবো।

কতো সদস্যের কমিটি হতে পারে, সে প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা একটা উদ্ভূত পরিস্থিতি। এখানে সরকারি দলের যারা আইন বিশেষজ্ঞ আছেন, তাদের রাখতে চাই। বিরোধী দলের যারা আইন বিশেষজ্ঞ আছেন, তাদের রাখতে চায়। আইন বিশেষজ্ঞ না থাকলে অন্যান্য দলের প্রতিনিধি রাখতে চাই। সবমিলিয়ে ২০ বা ১৮ বা ১৫ সদস্যের কমিটি করতে চাই। এটা নির্দিষ্ট না।

সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্য সম্পর্কে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান সংশোধনকে এমন পর্যায়ে নিতে চাই, যাতে বারবার আমাদের কাঁচি চালাতে না হয়।

বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে না থাকার কথা বলছে- এর প্রতিক্রিয়ায় নূরুল ইসলাম মনি বলেন, তাদের এ অবস্থান সঠিক হবে না। আজ বা কাল হোক সংবিধান সংশোধন আমাদের করতেই হবে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তাদের আমরা চাই। এক হাতে যেমন হ্যান্ডশেক হয় না, কাঁচির একটা অংশ দিয়ে যেমন চুল কাটা যাবে না, দুটোই লাগবে। আমরা সেটাই চাই ওনারা থাকুক। তারা কমিটিতে থাকবেন বলে আমরা আশা করি। তার মতে, সংবিধান সংশোধন ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। জুলাই সনদ অনুযায়ী এটা করা উচিত। এটা আমরা দেশের জন্যই করবো। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বা আমার কোনো বিশেষ সুবিধা হবে? উনার বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে? যেটা দেশের জনগণের কল্যাণে হবে, তাতে দ্বিমত করার কিছু আছে বলে মনে করি না।

সংসদ কমিটির বৈঠকের তথ্য দিয়ে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে সংসদ অধিবেশন কক্ষে এমন সাউন্ড সিস্টেম বসানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যা শব্দ তৈরি হওয়ার এক সেকেন্ড বা তার কম সময়ের মধ্যে তা শোষণ করতে পারবে এবং প্রতিধ্বনি থাকবে না। অধিবেশন কক্ষে ইন্টারনেটের ধীরগতি দূর করার ব্যবস্থাও নিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সংসদ এলাকায় পর্যাপ্ত সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আগামী ১০ তারিখের মধ্যে বাসা প্রস্তুত করে সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন