লাখো মাইল দূরে মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় আজ পর্দা উঠবে বিশ্বকাপ ফুটবলের, তার আগেই সেই ফুটবল জাদুতে বুঁদ পুরো বাংলাদেশ। ভৌগোলিক দূরত্ব যাই হোক না কেন, ফুটবল নিয়ে বাঙালির চিরচেনা আবেগ আর উন্মাদনা প্রমাণ করে দিচ্ছে বিশ্বকাপের একটি পরিধি যেন মিশে আছে এই লাল-সবুজের বুকেও।
বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তর আমেরিকা ভ্রমণে এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী কানাডা ও মেক্সিকো। তিন দেশের বিশ্বকাপে অংশ নিবে সর্বাধিক ৪৮ দেশ। স্বাভাবিকভাবে খেলাও হবে বেশি, ১০৪টি। আজ মেক্সিকো সিটিতে উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। আসর শেষ হবে ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মেক্সিকো সিটির সঙ্গে হবে টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসে। এই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংগীত, সংস্কৃতি ও ফুটবলের এক অনন্য মেলবন্ধ হবে। এই মেলবন্ধনই যেন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। বিশেষ করে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বাড়তি উৎসাহ। অনেকেই নিজেদের বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা দোকানের সামনে প্রিয় দলের পতাকা টানিয়ে সমর্থন প্রকাশ করছেন। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট দীর্ঘ পতাকা তৈরি করে আলোচনায় এসেছেন সমর্থকরা।
বিশ্বকাপকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক আলোচনা। ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রিয় দল ও খেলোয়াড়দের নিয়ে পোস্ট, ভিডিও এবং বিশ্লেষণমূলক কনটেন্ট প্রকাশ করছেন ভক্তরা।
তরুণদের পাশাপাশি বয়স্কদের মধ্যেও বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। চায়ের দোকান, অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফুটবলই এখন আলোচনার প্রধান বিষয়। খেলা উপভোগের জন্য বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় ম্যাচ দেখার আয়োজন করা হচ্ছে। স্থানীয় ক্লাব, যুবসংগঠন এবং ব্যবসায়ী মহল এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রাত জেগে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফুটবলপ্রেমীরা। অনেকেই বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে ম্যাচ উপভোগের পরিকল্পনা করছেন। পুরান ঢাকার স্বামীবাগের কে এম দাস লেনের একটি গলির নামই হয়েছে ‘ফিফা গলি’। গুগল ম্যাপেও মেলে এই ঠিকানা। এর কারণ ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে এলাকাবাসীর উন্মাদনা। গলির দেয়ালগুলো রঙিন হয়ে উঠেছে বিশ্বসেরা ফুটবলারদের মুখচ্ছবিতে, বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দেশগুলোর পতাকায়। জার্মানির পতাকা বানিয়ে এবারও হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছেন মাগুরার সদর উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের আমজাদ হোসেন। এবার তিনি ৩০ শতক জমি বিক্রি করে জার্মানির পতাকা তৈরি করেছেন। গতকাল মাগুরা সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর স্কুল মাঠে বিশাল এলাকাজুড়ে এই পতাকা প্রদর্শন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জার্মানী ফুটবল দলের ভক্তরা তার এ পদর্শনী দেখতে আসেন। প্রতি বিশ্বকাপেই তাঁর বানানো পতাকার দৈর্ঘ্য বাড়ে। এর আগেও তিনি বিশ্বের দীর্ঘতম জার্মানির পতাকা বানিয়ে প্রদর্শন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছেন। ২০০৬ সালে প্রথমে দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের জার্মানির পতাকা তৈরি করেন তিনি। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের সময় পতাকা হয় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ। ২০১৪ সালে সাড়ে তিন কিলোমিটার। ২০১৮ সালে পতাকার দৈর্ঘ্য ছিল সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। এবারের বিশ্বকাপ উপলক্ষে আমজাদ তৈরি করছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। পতাকা, জার্সি, ব্যানার, হেডব্যান্ড ও অন্যান্য খেলাসামগ্রীর বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ।
বিক্রেতারা বলছেন, বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ক্রেতাদের ভিড়। বিশেষ করে জনপ্রিয় দলগুলোর জার্সির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি বিক্রি হচ্ছে দেদারচ্ছে।
অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিটিভিতে বিশ্বকাপ: শুরুতে বিশ্বকাপ সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের বিনিময়ে বিটিভি খেলা দেখিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এবার বিটিভির কাছে ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছিল সিঙ্গাপুর ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। পরে সরকার সরাসরি ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করে ৫০ কোটি টাকার কম মূল্যে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা থেকে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখানোর সম্প্রচারস্বত্ব কিনছে সরকার। ফিফা থেকে কোনো দরপত্র ছাড়া অর্থাৎ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্য এ স্বত্ব কেনা হয়েছে। বিটিভি আবার এই স্বত্ব সময় টিভি ও টি স্পোর্টসের কাছে বিক্রি করেছে। এছাড়া বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও সরাসরি দেখা যাচ্ছে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ।
বাংলাদেশ আছে শুধু ফ্যান জার্সিতে: বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফিফার অফিশিয়াল জার্সি কিংবা অংশগ্রহণকারী কোনো দলের জার্সিতে এবার জায়গা করে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকছে দর্শকদের জন্য তৈরি ‘ফ্যান জার্সি’ ও টি-শার্টে। তবে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের নিচে থাকা ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো বিশ্বকাপের অফিশিয়াল জার্সি তৈরির কাজ পেয়েছে। তাতে বিশ্বকাপের মাঠেই থাকছে এসব দেশের নাম; আর মাঠের বাইরে গ্যালারি কিংবা গ্যালারির বাইরে দর্শক-ভক্তদের জার্সি বা টি-শার্টে থাকবে লাল-সবুজের বাংলাদেশের নাম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফুটবল ও ফিফার লোগো-সংবলিত জার্সি, টি-শার্ট ও হুডি মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার পিস পোশাক। এসব পোশাকের রপ্তানিমূল্য প্রায় ৩৭ লাখ ডলার; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩৩টি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা এসব পণ্য রপ্তানি করেছে ১৮টি দেশে।
জায়ান্ট স্ক্রিনে বিশ্বকাপ: ঢাকা ও সারাদেশে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখা যাবে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বড় পর্দায় খেলা দেখার দারুণ সুযোগ থাকছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিল ও বনানীর মতো জনপ্রিয় পাবলিক স্পেসগুলোতে বড় প্রজেক্টরে খেলা প্রদর্শনের বিশাল আয়োজন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এছাড়াও, স্থানীয় ফ্যান ক্লাব এবং বড় শপিংমলগুলো তাদের নিজস্ব জায়ান্ট স্ক্রিনে বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো সম্প্রচার করে থাকে।
