প্রস্তুত মহামঞ্চ। ফুরালো অপেক্ষা। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর- ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে আজ। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকারবিপক্ষে স্বাগতিকদের ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপ আসরের। খেলা শুরু বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়। তার আগে ‘দাই দাই’ উন্মাদনায় মাতবে গোটা বিশ্ব। খেলা শুরুর আগে আজতেকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করবেন পপ স্টার শাকিরা। সঙ্গে থাকছেন ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের থিম সং ‘দাই দাই (চলো এগিয়ে)’-এর সহশিল্পী বার্না বয়। মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বদেশীয় সংস্কৃতি, আধুনিক লোকশিল্প এবং ‘পাপেল পিকাডো’ প্রদর্শিত হবে। এতে শাকিরা, জে বালভিন, মানা, লিলা ডাউনসসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী অংশ নেবেন। আয়োজক তিন দেশেই হবে পৃথক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী নোরা ফাতেহিকে দেখা যাবে কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে। এতে থাকবে বৃহৎ ভিজ্যুয়াল শো এবং কেটি পেরি, ফিউচার, আনিতা, এলএলএ ও রেমার মতো প্রমুখ শিল্পীদের পারফরম্যান্স।
উদ্বোধনী দিনের অন্য ম্যাচে কাল সকাল ৮টায় মুখোমুখি হবে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। সহ-আয়োজক কানাডা তাদের প্রথম ম্যাচটি খেলবে শুক্রবার টরন্টোতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে। মূল আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র লস অ্যাঞ্জেলেসে পরদিন সকাল ৭টায় প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবে। এরপর আগামী দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৩টি থেকে সর্বোচ্চ ৬টি পর্যন্ত ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। আসর শুরুর আগে আলোচনায় বেশ কিছু ইস্যু। উত্তর আমেরিকার গরম আবহাওয়া, নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, দীর্ঘ আসর নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। সর্বশেষ বিশ্বকাপ আসরটি হয়েছিল কাতারে ছোট্ট একটা বলয়ে। ঠিক পরের বিশ্বকাপটি হচ্ছে গোটা একটি মহাদেশ জুড়ে। বিশ্বকাপের ভেন্যু কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়াম থেকে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামের দূরত্ব প্রায় ৪৪০ কিলোমিটার।
১৯৩০ সালে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্ট এবারই প্রথম ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবার দলের সংখ্যা ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন ফরম্যাটে ৪৮ দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথাগতভাবে প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল নকআউটে যাবে। তবে এবার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১২ গ্রুপের সেরা ৮টি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও নকআউট পর্বে যাওয়ার সুযোগ পাবে। ফলে নকআউট পর্বের আকার ১৬ থেকে বেড়ে ৩২ দলের হচ্ছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ মিলে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই আয়োজন করবে ৭৮টি ম্যাচ (৭৫%)। কানাডা এবং মেক্সিকো ১৩টি করে ম্যাচ আয়োজন করবে। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে পরবর্তী সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। আগামী ১৯শে জুলাই নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হবে ফাইনাল।
গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টার ফুটবল উন্মাদনা উপভোগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। প্রথম দুই দিনে দুটি করে ম্যাচ থাকবে, যেখানে স্বাগতিক মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ঘরের মাঠে ম্যাচ খেলে টুর্নামেন্ট শুরু করবে। এরপরই বাড়বে রোমাঞ্চ। ১৩ই জুন থেকে ২৭শে জুন পর্যন্ত প্রতিদিন অন্তত চারটি করে ম্যাচ থাকবে, যা পূর্ব দেশীয় সময় দুপুর বা বিকালের দিকে শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে। এর সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে ২৪শে জুন বুধবার থেকে ২৭শে জুন শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন ছয়টি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। কারণ, এই দিনগুলোতে গ্রুপের দলগুলো তাদের শেষ ম্যাচগুলো খেলবে এবং প্রতি সময়স্লটে দুটি করে ম্যাচ একই সঙ্গে মাঠে গড়াবে। গ্রুপ পর্বের এই ৭২টি ম্যাচের বিশাল মহাযজ্ঞ পুরো জুন মাস জুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের বুঁদ করে রাখবে। এবারের বিশ্বকাপে থাকছে নতুন কিছু নিয়ম কানুন। গ্রুপ পর্বে পয়েন্ট সমান হলে আগে ‘গোল ব্যবধান’ দেখা হতো। তবে এবার প্রথম টাইব্রেকার হবে হেড-টু-হেড (মুখোমুখি ম্যাচের ফলাফল)। এরপর দেখা হবে মুখোমুখি ম্যাচের গোল ব্যবধান এবং গোল সংখ্যা। এগুলোও সমান হলে সামগ্রিক গোল ব্যবধান ও ফেয়ার প্লে পয়েন্ট (হলুদ/লাল কার্ডের সংখ্যা) বিবেচনা করা হবে।
আসরে থাকছে হাইড্রেশন ব্রেক। আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, খেলোয়াড়দের স্বস্তি দিতে এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের সুযোগ বাড়াতে প্রতি অর্ধেকের মাঝামাঝি সময়ে ৩ মিনিটের দুটি বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক থাকবে
কাদের গায়ে ফেভারিটের তকমা?
বেটিং বাজারের দর অনুযায়ী এবার কোনো একক ফেভারিট নেই, তবে রেসের শীর্ষে রয়েছে কয়েকটি দল।
স্পেন ও ফ্রান্স (যৌথ ফেভারিট, ১৭% সম্ভাবনা): বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের আক্রমণভাগে থাকছেন ১৮ বছর বয়সী বার্সেলোনা তারকা লামিন ইয়ামাল (যিনি ইনজুরি কাটিয়ে ফিরছেন)। অন্যদিকে ফ্রান্সের নেতৃত্বে আছেন রিয়াল মাদ্রিদের তুখোড় ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি গত দুটি বিশ্বকাপে ১২ গোল করেছেন।
ইংল্যান্ড (১২% সম্ভাবনা): বায়ার্ন মিউনিখের গোলমেশিন হ্যারি কেইনের ওপর ভর করে ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বড় ট্রফি জয়ের খোঁজে নামবে ইংলিশরা।
আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও পর্তুগাল (১০% সম্ভাবনা): বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন স্কোয়াড ধরে রাখলেও ৩৮ বছর বয়সী লিওনেল মেসি হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে ভুগছেন। ব্রাজিলের নেইমার এবং ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোদালদো (পর্তুগাল) নিজেদের চোট ও ফর্ম নিয়ে শেষ বিশ্বকাপ স্মরণীয় করতে লড়বেন।
জার্মানি: চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে গোনার বাইরে রাখা যাবে না। ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, জামাল মুসিয়ালা, জশুয়া কিমিক, কাই হাভার্টজ, অ্যান্তোনিও রুডিগাররা দেখা তে পারেন জার্মান মেশিনের ক্যারিশমা।
অনুপস্থিত ইতালি: চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি এবারও যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। প্লে-অফে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হেরে তারা টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের বাইরে।
ডার্কহর্স বা আন্ডারডগ: বেশ কিছু ‘ডার্কহর্স’ বা ‘আন্ডারডগ’ দল বড় দলগুলোকে চমকে দেয়ার আভাস দিচ্ছে। স্কটল্যান্ড তাদের প্রস্তুতি ম্যাচে কুরাসাও এবং বলিভিয়ার বিপক্ষে ৮ গোল দিয়ে দারুণ ছন্দে আছে । নরওয়ে সহজেই সুইডেনকে হারিয়েছে এবং মরক্কোর সঙ্গে ড্র করেছে; মার্টিন ওডেগার্ড এবং আর্লিং হালান্দের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া নরওয়ে দলটি বেশ ভারসাম্যপূর্ণ।
আইভরি কোস্ট গত সপ্তাহে ফ্রান্সকে হারিয়েছে এবং তাদের আক্রমণভাগ তুখোড়। একই কথা ইকুয়েডর ও সেনেগালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যারা যেকোনো বড় দলকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। এছাড়া পর্তুগাল ও বেলজিয়াম ঐতিহ্যগত ডার্কহর্সের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে এবং একঝাঁক নতুন প্রতিভা নিয়ে তারা বেশ শক্তিশালী। অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসকেও কোনোভাবেই বাতিলের খাতায় রাখা যাবে না, তাদের দলে যুব ও অভিজ্ঞতার চমৎকার সংমিশ্রণ রয়েছে। ১৯৯৪ সালে যখন উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্রে) বিশ্বকাপ হয়েছিল, তখন সুইডেন ও বুলগেরিয়া সেমিফাইনালে উঠে সবাইকে চমকে দিয়েছিল এবং রোমানিয়া ও নাইজেরিয়া রূপকথার মতো পারফরম্যান্স করেছিল। এই গ্রীষ্মেও তেমন দুই-একটি রূপকথার গল্প দেখার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
