সেই যে জোহানেসবার্গের তপ্ত দুপুরে সিফিওয়ে শাবালালার ওই বুলেট গতির শটটা মেক্সিকোর জাল কাঁপিয়েছিল, আর গ্যালারি জুড়ে বেজে উঠেছিল লক্ষাধিক ভুভুজেলা- ফুটবলপ্রেমীদের মনে কি সেই সুর আজও অদ্ভুত এক দোলা দেয় না? ১৬ বছর পর ইতিহাসের চাকা ঘুরে আবার এক বিন্দুতে। সেই মেক্সিকো, সেই দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে এবার আর জোহানেসবার্গের সকার সিটি নয়, ক্যানভাস এবার মেক্সিকোর ফুটবল- তীর্থ ‘এস্তাদিও আজতেকা’। ফুটবল মহারণের নবপদচারণা হচ্ছে এমনই এক পূণ্যভূমিতে যেখানে পেলে-ম্যারাডোনার পায়ের জাদু মিশে আছে ঘাসের প্রতিটি ডগায়। ৪৮ দলের এই মেগা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই কি তবে জমে থাকা কোনো পুরনো হিসেব চুকাবে বাফানা বাফানারা? নাকি আজতেকায় মেক্সিকান ওয়েভে ম্লান হবে বাফানা নৃত্য, লক্ষাধিক উন্মাতাল দর্শকের গগনবিদারী চিৎকারে খড়কুটোর মতো কি উড়ে যাবে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা? জবাব মিলবে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায়। মেক্সিকো মানেই তো এক উন্মাতাল ফুটবল ইউনিভার্স। মেক্সিকান ওয়েভ যখন ওঠানামা করে, প্রতিপক্ষের হৃদয়ে কম্পন ধরে যায়। কিন্তু এই চেনা ঢেউ নিজেদের ডুবিয়ে মারবে না তো? আবার কি হৃদয় ভাঙার গল্প শুনবে বিশ্ব? এর আগে ১৭ বার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে মেক্সিকো। কিন্তু মাত্র দুবার কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল দল। ১৯৭০ আর ১৯৮৬।
ঘরের মাঠে তৃতীয়বার কি কপাল খুলবে তাদের? এল ট্রি’রা কি পারবে তাদের ‘এল কুইন্টো পারদিতো (পঞ্চম ম্যাচের অভিশাপ) খণ্ডাতে? কোচ হাভিয়ের আগুইরেও পুরনো ক্ষত সারাতে চান। ২০১০ সালের উদ্বোধনী ম্যাচে যখন দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয়েছিল মেক্সিকো, সেই ম্যাচেও কোচ ছিলেন আগুইরে। তার আগে ২০০২ সালের আসরে প্রথমবার দায়িত্ব নেন তিনি। ১৬ বছর পর যেন নিজের অসমাপ্ত অধ্যায়টি নতুন করে লিখতে চাচ্ছেন এই কোচ। এক্ষেত্রে তাকে আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছে টানা ৮ জয়। কাজেই ২০১০ সালের ওই ১-১ ড্র থেকে এবার ভালো কিছু প্রত্যাশা করতেই পারে তার দল। মেক্সিকোর অধিনায়ক এডসন আলভারেজ এবং অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রাউল হিমেনেজের বার্তা, ‘আজতেকাকে দুর্গ বানাও।’ অন্যদিকে নিজেদের আন্ডারডগ ভাবতেই ভালো লাগছে দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রুসের। তিনি বলেন, ‘আন্ডারডগ হিসেবে থাকাটা আমাদের জন্য বরং বর হতে পারে।’ দলীয় অধিনায়ক ও গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের লক্ষ্য প্রথমবার নকআউট পর্বে খেলা। এই ম্যাচ তাদের কাছে শুধু উদ্বোধনী লড়াই নয় বরং নতুন ইতিহাসের শুরু। মেক্সিকানদের আসল শক্তি তাদের দুই উইংয়ের ক্ষিপ্রতা। ইউরোপ কাঁপানো ডিফেন্ডারদের অভিজ্ঞতা আর লিগা এমএক্স-এর তরুণ তুর্কিদের রক্ত। বারুদে আক্রমণভাগ দলটার। তবে রোগ অন্য জায়গায়। মেক্সিকো যখন অল-আউট আক্রমণে যায়, তাদের ডিফেন্স লাইনের পেছনে যে বিশাল ফাঁকা জমি তৈরি হয়, কাউন্টার-অ্যাটাকের গতিতে সেখানে হানা দিলে ছারখার হয়ে যেতে পারে স্বাগতিকদের রক্ষণ। এই ম্যাচে মেক্সিকো তাদের চিরচেনা ৪-৩-৩ ফরমেশনে দল সাজাতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকা দলটা কিন্তু এবার সাইলেন্ট কিলার। স্কোয়াডের একটা বড় অংশ ঘরোয়া লিগে দীর্ঘদিন একসাথে খেলার কারণে তাদের মধ্যকার বোঝাপড়াটা একদম পানির মতো পরিষ্কার। শারীরিক শক্তি আর ট্রানজিশনের গতিতে তারা যেকোনো ডিফেন্সের রক্ত হিম করে দিতে পারে। আর আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রুস বলেন, ‘তারা (মেক্সিকো) পরিপূর্ণ দল। প্রচুর মুভমেন্ট, দলীয় ঐক্য ও উচ্চাকাক্সক্ষা রয়েছে তাদের। তবে আমরা সিংহের মতো লড়বো।’ তবে বড় মঞ্চের স্নায়ুচাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা দক্ষিণ আফ্রিকার এই দলটার বড্ড কম। বিশেষ করে সেট-পিস ডিফেন্ড করার সময় তাদের বক্সে এক ধরনের হড়বড়ানি স্পষ্ট। রণকৌশল হতে পারে ৪-২-৩-১। মেক্সিকোর আক্রমণের তীব্রতা কমাতে তারা ডাবল-পিভট (দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার) ব্যবহার করতে পারে। মেক্সিকোকে আক্রমণ করতে দিয়ে তারা ওত পেতে থাকবে কাউন্টার-অ্যাটাকে ওড়ার জন্য। বাফানা বাফানা কোচ হুগো ব্রুস গেম প্ল্যান বাস্তবায়নের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সঠিক পরিকল্পনা
আছে, এখন মাঠে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।’ তবে আজতেকার উত্তপ্ত পরিবেশকে অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন এই কোচ। ব্রুস বলেন, ‘আমার দলের অনেক খেলোয়াড় আগে এমন পরিবেশে খেলেনি। তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে আজতেকার গর্জন উপেক্ষা করে নিজেদের খেলায় মনযোগ দেওয়া।’ আজতেকার ঐতিহাসিক মাঠে এর আগেও দুবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ হয়েছিল। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে ১৯৭০ সালে এখানে সবশেষ বিশ্বকাপ জেতেন। ৮৬’-তে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের সাক্ষীও এই মাঠে। এখানেই পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে তার অমরত্ব লাভ। এবার নতুন আঙিকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপটাও শুরু হচ্ছে আজতেকার বুকে। লিওনেল মেসি, রোনালদো, নেইমারের মতো অনেক তারকার শেষ আসর হতে যাচ্ছে এটি। মেক্সিকো-দ. আফ্রিকার ম্যাচের মধ্য দিয়ে আজতেকা যেন মেসি-রোনালদোদের কাছ থেকে ফুটবলের উত্তরাধিকার মশালটি তুলে দিচ্ছে ভবিষ্যত তারকাদের হাতে।
