পাহাড় আর অরণ্যের মায়ায় হৃদয়ছোঁয়া এক শহর গুয়াদালাহারা। সেখানে স্তাদিও আকরন স্টেডিয়ামটি যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের ডাকছে। যেন বলছে, ‘সবুজের সমারোহে উপভোগ করে যাও আগুন-বরফের যুদ্ধ। এখানে বিশ্বকাপের ‘এ’ গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। আগামীকাল বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টায় মাঠে নামবে দু’দল। দুটো ভিন্ন দর্শনের ফুটবল লড়াই। এশিয়ান জায়ান্ট কোরিয়ার হাই প্রেসিং আক্রমণাত্মক ফুটবলের বিপরীতে চেক প্রজাতন্ত্রের ঠাণ্ডা মাথার সংগঠিত আক্রমণ। গতি বনাম শৃঙ্খলার এই যুদ্ধে শেষ হাসি হাসতে চাইবে দু’দলই। দক্ষিণ কোরিয়া ২০০২ সালের সাফল্যকে ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় উঠতে চাইছে। সেবার ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত আসরে সেমিফাইনাল খেলে দলটি।
সম্প্রতি ফিফাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে কোরিয়ার কোচ হং মাইয়াং-বো জানান, কোরিয়ার কাছে বিশ্বকাপ আর ভয়ের কোনো মঞ্চ নয়। চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়েই মিশন শুরু করতে চায় তারা। প্রথম ম্যাচেই যে পুরো টুর্নামেন্টের ফাইন টিউন গড়ে দেয়, সে কথা খেলোয়াড়দের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। দলের রণকৌশল কী হবে সে ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা কোরিয়ান কোচের। বাইরের কোনো দর্শক তাদের শেষ প্রস্তুতি দেখতে পারেনি। খেলোয়াড়দের মধ্যেও দৃঢ় মানসিকতা। গোলরক্ষক কিম সিউং গুয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতির জন্য পরিবারকে বিসর্জন দিয়েছেন। সন্তানের জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেননি। দেশের হয়ে ৮০ ম্যাচ ও তিনটি বিশ্বকাপ খেলা এই গোলরক্ষকের এটাই শেষ যাত্রা। আর শেষটা তিনি রাঙাতে চান দারুণভাবেই। সংবাদমাধ্যমকে কিম বলেন, ‘আমি দুঃখিত। আমার স্ত্রীর পাশে থাকতে পারিনি। আমি উপহার হিসেবে ভালো ফল নিয়ে ঘরে যেতে চাই।’ অন্যদিকে ২০ বছর পর বিশ্বমঞ্চে সুযোগ পাওয়া চেক প্রজাতন্ত্রের লক্ষ্য ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। সাবেক চেকোস্লোভাকিয়া ১৯৩৪ ও ১৯৬২ সালের আসরে রানার্সআপ হয়েছিল। স্বাধীনতা লাভের পর চেক প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ সাফল্য ২০০৬ সালের গ্রুপ পর্ব। ফিফাকে দেয়া সাক্ষাতকারে চেক কোচ মিরোস্লাভ কুবেক বলেন, ‘আমাদের দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানসিক দৃঢ়তা। আমাদের নিজস্ব খেলার ধরন আছে। যেখানে কৌশল, দক্ষতা ও সংগঠিত ফুটবল গুরুত্ব পায়।’
শুধু খেলা নয়, আনন্দময় খেলা উপহার দিতে চান এই কোচ। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আমার দল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলুক। এমন একটি ধারা উপহার দিই যা দর্শকদের আনন্দ দেয়। অবশ্যই আমরা সাফল্যও চাই।’
চেক প্রজাতন্ত্রের অধিনায়ক টমাস সুচেক ছোটখাটো ভুলকেও এড়িয়ে যেতে চান। দক্ষিণ কোরিয়ার গতিময় উইং প্লে ও কাউন্টার অ্যাটাককে মাঝমাঠেই থামানোর লক্ষ্য এই মিডফিল্ডারের। দলের প্রধান অস্ত্র প্যাট্রিক শিক শারীরিক সক্ষমতায় এগিয়ে রাখছেন নিজেদের। তবে এই ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দিতে পারে ভৌগোলিক পরিবেশ। মেক্সিকোর জনপ্রিয় ক্লাব শিভাস গুয়াদালাহারা’র হোম গ্রাউন্ড স্তাদিও আকরন। ফুটবলের প্রতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আকর্ষণ তীব্র। কাজেই দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র উভয়েই ভালো সমর্থন পাবে। তবে আকরন শুধু মাঠ নয়। এটি এক পরীক্ষাক্ষেত্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০০ মিটার উঁচু এই মাঠে খেলোয়াড়দের স্ট্যামিনা দ্রুত কমে যেতে পারে। গুয়াদালাহারার আবহাওয়া গরম ও শুষ্ক। ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকিও বেশি। বলের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত মনে হতে পারে। প্রথম ২০-৩০ মিনিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। খেলার ধরন ও শারীরিক দক্ষতার বিচারে দক্ষিণ কোরিয়ার গতিময়তা এই মাঠে কাজে নাও লাগতে পারে। বরং পজেশন ভিত্তিক ধীর খেলা দলগুলো এমন
কন্ডিশনে দীর্ঘ সময় স্ট্যামিনা ধরে রাখার সুবিধা পাবে। সে হিসাবে এগিয়ে রাখা যায় চেক প্রজাতন্ত্রকে। প্যাট্রিক শিক ও টমাস সুসেক জুটিকে ঘিরে কৌশল সাজাবেন কোচ। শিককে সামনে রেখে ৪-৩-২-১ অথবা ৫-৩-২ ফরমেশন ব্যবহার করতে পারেন তিনি। দক্ষিণ কোরিয়ার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেবেন হোয়াং হি-চান। সঙ্গে আছেন অভিজ্ঞ সং হিউং-মিন। তাদের ফরমেশন হতে পারে ৪-২-৩-১। যেখানে মিনের ভূমিকা হতে পারে ফলস নাইন। চেক রিপাবলিক ও দক্ষিণ কোরিয়া এ পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে তিন ম্যাচে। একটি করে জয় পেয়েছে উভয়েই। সর্বশেষ ২০১৬ সালের প্রীতি ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ২-১ গোলে জয় পায়।
