অবসরেও চেয়ার ছাড়েন না তারা

সিলেট সেটেলমেন্ট

অবসরেও চেয়ার ছাড়েন না তারা

ফন্ট সাইজ:

অবসরেও খণ্ডকালীন তারা। অথচ কোনো অফিস আদেশ নেই। দিব্যি চেয়ারে বসছেন। ফাইলপত্র গুছিয়ে দিচ্ছেন। নিচ্ছেন টাকাও। অনেকেরই চাকরি শুরু এখান থেকেই। আবার শেষও এখানেই। দীর্ঘদিনের গড়া সিন্ডিকেটের কারণে অবসরকালীন সময়েও টাকার ধান্ধা তাদের ছাড়েনি। সিলেট সেটেলমেন্ট। দুর্নীতি যার রন্দ্রে রন্দ্রে। ভূমি জরিপের দীর্ঘ যাত্রা। ৩৫-৩৬ বছরের ইতিহাস। এখনো অর্ধশতাধিক মৌজা গেজেটের অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। আর মৌজাগুলোকে কেন্দ্র করে সেটেলমেন্টের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল দুর্নীতির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গেল ৪-৫ বছর ধরে ওই সিন্ডিকেটের কর্মকর্তাদের অবসরে যাওয়া শুরু হয়েছে। এখনো যাচ্ছেন অনেকেই। ওই অফিসের চার কর্মচারী। নানা সময় দুর্নীতির অভিযোগ এসেছিল তাদের বিরুদ্ধে।

গত এক বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তারা একেক করে অবসরে গেছেন। তবে অবসর হলেও নিজের চেয়ার কিংবা আসন কোনোটিই তারা ছাড়েননি। অফিসে বসে আগের মতোই দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের নিয়ন্ত্রণেই সিলেট সেটেলমেন্ট কার্যালয়। এরা হচ্ছেনÑ সিলেট সেটেলমেন্টের সাবেক রেকর্ড কিপার ও ভারপ্রাপ্ত পেশকার সাধন কুমার চাকমা, খারিজ সহকারী ও ভারপ্রাপ্ত নাজির মৃনাল কান্তি সরকার, যাঁচ মোহরার ও হিসাব সহকারী হুমায়ূন কবির, যাঁচ মোহরার ও চেইনম্যান অনিক চাকমা। সূত্র জানিয়েছেÑ সাধন কুমার চাকমা গত ৩০শে মার্চ অবসরে যান। এখন তিনি অবসরকালীন কর্মচারী। কিন্তু পেশকার সেরেস্তা শাখায় তিনি নিয়মিত অফিস করছেন। বসছেন সেই আগের চেয়ারে। তাকে ঘিরে পূর্বের দুর্নীতিবাজ চক্র এখনো সক্রিয়। নানা দাপ্তরিক বিষয়ের জরুরি কাগজপত্র সাধনই জোগার করে দিতে পারেন। ফলে তার টাকার প্রবাহ আগের মতোই রয়েছে। সিলেট থেকেই চাকরি শুরু সাধনের। তিনি চাকরিকালীন সময়ে সিলেট থেকে কয়েকবার স্ট্যান্ড রিলিজ হয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাকে সরাতে পারেনি। বারবার তার বদলির আদেশ স্থগিত রয়েছে। কর্মকর্তা, কর্মচারীরা জানিয়েছেনÑ সাধন কুমার চাকমা সিলেটে চাকরি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে। সিলেট ও তার নিজ বাড়ি খাগড়াছড়ির পানছড়িতে বিপুল সম্পত্তি করেছেন। খারিজ সহকারী ও ভারপ্রাপ্ত নাজির মৃনাল কান্তি সরকার ২০২৫ সালের ৩১শে আগস্ট চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি এখনো নেজারত শাখায় তার আগের চেয়ারে বসে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরি জীবনে তিনি টপ উপজেলাগুলোতে (প্রবাসী অধ্যুষিত) চাকরির পর দুই বছর আগে সিলেট সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে আসেন। ওখানে তিনি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সদস্য হয়ে দু’হাতে টাকা কামিয়েছেন। হুমায়ূন কবির যাঁচ মোহরার ও হিসাব সহকারী হিসেবে ২০২৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর চাকরি থেকে অবসর নেন। চেয়ার, টেবিল নিয়ে দিব্যি তিনি অফিস করে যাচ্ছেন। সেটেলমেন্টের ক্রয়, বিক্রয় সংক্রান্ত নানা জিনিসপত্র তার হাত ধরেই করা হয়। ওখানে বছরের পর বছর টাকা কামিয়েছেন তিনি। চাকরি জীবন শুরুও এই সেটেলমেন্টে, অবসরও নিয়েছেন ওখান থেকেই। অনিক চাকমা চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি যাঁচ মোহরার হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।

কর্মচারীরা জানানÑ গেজেট না হওয়া মৌজার ৫৩৩ ধারার শুনানির প্রতিবেদন এখনো তৈরি করেন অনিক চাকমা। ফলে এখানে তার কারসাজি অব্যাহত রয়েছে আগের মতোই। তারা জানিয়েছেনÑ ওই চার অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী সিলেট সেটেলমেন্টে চাকরি জীবনে দাপট খাটিয়েছেন এক তরফা। অবসর নেয়ার পরও তারা অফিস করছেন, আগের মতোই নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে টাকা উপার্জন করে চলেছেন। কর্তৃপক্ষও তাদের ব্যাপারে নীরব। এ ব্যাপারে অনিক চাকমা মানবজমিনকে জানিয়েছেনÑ তার পদে এখনো কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এ কারণে অবসর নেয়ার পরও কর্তৃপক্ষের কথায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মৃনাল কান্তি সরকার জানিয়েছেনÑ তিনি অবসরে আছেন। তবে ডাকলে অফিসে আসেন। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় সময় সহযোগিতা করতে হয়। কাজ বুঝিয়ে দিতে হয়। এ কারণে তিনি অফিসে আসেন। তবে এখন কোনো ফাইলে স্বাক্ষর দেন না। সিলেট জোনাল সেটেলমেন্টের ভারপ্রাপ্ত সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানা গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেনÑ যারা অবসর নিয়েছেন তাদের স্থলে অনেককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কাজ বুঝিয়ে দিতে হয়তো কেউ কেউ আসছেন। অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করে কাউকে কাউকে অফিসে ডাকা হয়। তবে চাকরিকালীন সময়ের মতো তাদের এখন আর চেয়ার টেবিল নেই বলে জানান তিনি।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন