বোয়িং-এয়ারবাস টানাপোড়েন: ইউরোপের চোখ ঢাকায়

ইউরোপের চিঠি

বোয়িং-এয়ারবাস টানাপোড়েন: ইউরোপের চোখ ঢাকায়

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কেনা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে যে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে, তা নিছক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; বরং এটি এখন বহুমাত্রিক কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিলেও এয়ারবাসের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি, আলোচনা চলছে এবং তারা আশা করছেন যে এয়ারবাসকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।

বিষয়টি শুধু একটি কোম্পানির কাছে বিমান বিক্রির প্রশ্ন নয়। এটি আসলে বড় শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্কের প্রতিফলন। বিশ্বের বাণিজ্যিক বিমান নির্মাণ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরেই দুটি প্রধান শক্তি আধিপত্য বিস্তার করে আসছে, আমেরিকার বোয়িং এবং ইউরোপের এয়ারবাস। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান বিমান বাজারে তাই এই দুই জায়ান্টের প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়াই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা নতুন নয়। দেশের বিমান পরিবহন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ, যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কার্গো পরিবহনের সম্ভাবনা, সবকিছু মিলিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দীর্ঘদিন ধরেই বহর বাড়ানোর পরিকল্পনা করে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সভিত্তিক ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনাও এগিয়েছিল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ঢাকায় সফরকালে ঘোষণা করেছিলেন যে বাংলাদেশ এয়ারবাস থেকে দশটি বড় উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে আটটি যাত্রীবাহী এবং দুটি কার্গো বিমান।

কিন্তু রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতা অনেক সময় পরিকল্পনাকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সেই আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক বাস্তবতা তৈরি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হলে ঢাকার কূটনৈতিক হিসাব পাল্টাতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রেক্ষাপটে মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

এই সিদ্ধান্তের ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপীয় মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের অন্যতম বড় বাজার। সেই কারণে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের সম্পর্কও বিবেচনায় রাখা উচিত।

ঢাকায় জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটৎসের বক্তব্য এই আলোচনাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। তিনি সরাসরি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ যদি এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তাহলে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। কূটনৈতিক ভাষায় বলা হলেও এই বক্তব্য মূলত একটি সতর্কবার্তা বলেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত অবশ্য তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আলোচনা চলছে এবং শেষ পর্যন্ত কী হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে তার বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—উড়োজাহাজের উৎস, বৈচিত্র্য বা “সোর্সিং ডাইভারসিফিকেশন”-এর গুরুত্ব। বিশ্বের বড় এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত একাধিক নির্মাতার উড়োজাহাজ ব্যবহার করে, যাতে প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য হতে পারে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত কী হতে পারে?

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন বাজারে রপ্তানি প্রবেশাধিকার এবং শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। তৈরি পোশাক শিল্পের বিশাল অংশ ইউরোপীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এক পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্য পক্ষকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি বাস্তব দ্বিধা তৈরি করেছে।

তবে কেবল কূটনৈতিক চাপের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের জন্যই ভালো কৌশল নয়। একটি রাষ্ট্রের ক্রয়নীতি মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক লাভ, প্রযুক্তিগত সুবিধা, অপারেশনাল দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

বিমান বহর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু বিমান কেনাই শেষ কথা নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আর্থিক সুবিধা। অনেক সময় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতা দেশকে বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন সুবিধা, প্রযুক্তি স্থানান্তর বা প্রশিক্ষণ সহায়তাও দেয়। ফলে কোন কোম্পানির প্রস্তাব সামগ্রিকভাবে বেশি লাভজনক, সেটি বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিমান পরিবহন খাতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। ভবিষ্যতে যদি ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক বিমান হাব হিসেবে গড়ে উঠতে চায়, তাহলে বহরের ধরন, রুট পরিকল্পনা এবং কার্গো সক্ষমতা সবকিছুই নতুন করে ভাবতে হবে। সেই প্রেক্ষাপটে যেসব উড়োজাহাজ জ্বালানি সাশ্রয়ী, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং পরিচালনায় কম খরচের, সেগুলোই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য কম নয়। বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারতের মতো শক্তিধর দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাও জরুরি। ফলে বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে।

নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্যে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির ভিত্তিতে অর্থাৎ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দিক নির্দেশনা। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতায় ছোট বা মাঝারি আকারের দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্বার্থ, এই দুইয়ের সমন্বয় করেই এগোতে হয়।

বিমান কেনা নিয়ে বর্তমান বিতর্ক সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। এখানে বোয়িং বা এয়ারবাস কোনটি ভালো, সেই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো কোনটি বাংলাদেশের জন্য বেশি উপযোগী এবং লাভজনক।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক, সেটি যেন হয় স্বচ্ছ বিশ্লেষণ, পেশাগত মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। কারণ উড়োজাহাজ কেনা শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; এটি একটি দেশের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং ভবিষ্যৎ বিমান শিল্পের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাপের রাজনীতি নয়, বরং বিচক্ষণতার সঙ্গে সঠিক পথ বেছে নেওয়া। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার এই মুহূর্তে সেটিই হবে প্রকৃত কৌশলগত সাফল্য।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন