১৯৭২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বেশ দীর্ঘ একটি সময়। এই দীর্ঘ সময় নিয়ে অল্প একটু পথ হাঁটলে যে দশা হবে আমাদের পর্যটনেরও হয়েছে সেই দশা। অথচ পর্যটন সম্পদ তথা পর্যটক আকর্ষণের দিক থেকে বাংলাদেশ সব সময়েই ছিল এগিয়ে। তার সাথে পর্যটন উন্নয়নের আর এক জরুরী উপাদান অর্থাৎ মানব সম্পদও ছিল পর্যাপ্ত। তাহলে পর্যটনের কাঙ্খিত উন্নয়ন বলতে যা বুঝায় তা হলো না কেনো? এজন্য কে বা কারা দায়ী? ইত্যকার নানা প্রশ্ন যে কারো মনে আসতেই পারে। তবে এসবের উত্তর খুঁজতে হলে দেখা যাবে এতদিনের একটি বিষয়ের সাথে অনেক কিছুই সম্পৃক্ত। তার সবকিছু না হলেও অন্তত মোটা দাগের বিষয়গুলো চিহ্নিত করা দরকার। এক্ষেত্রে কিছু প্রশ্ন সামনে রেখে উত্তর খুঁজলে অবশ্যই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে এবং নি:সন্দেহে।
প্রথমেই দেখে নেয়া ভালো পর্যটন থেকে এ পর্যন্ত আমাদের প্রাপ্তিটাইবা কি। কারণ, পর্যটন আমাদের কিছুই দেয়নি এমন নৈরাশ্যবাদীতায় ভোগাটাও বোধহয় সমীচীন হবে না। কেন না পর্যটন চর্চা শুরু হয়েছিল বলেই আমরা এর সাথে পরিচিত হতে পেরেছি, দেশ-বিদেশ ভ্রমণে যেতে শিখেছি, এ নিয়ে ব্যবসা করতে শিখেছি, চাকুরী দেয়ার ও করার সুযোগ পাচ্ছি, মোটা অংকের বিনিয়োগ করতে পারছি, প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ পেয়েছি এবং উচ্চ শিক্ষারও সুযোগ পাচ্ছি যা কিন্তু নেহায়েত কম নয়। তাছাড়াও লেখা-লেখি, আলোচনা-সমালোচনা, বক্তৃতা-বিবৃতি, সভা-সমিতি, পদ-পদবী ইত্যকার সুযোগ তো রয়েছেই। তাহলে ঘাটতিটা কোথায় যা কি না পর্যটনের উন্নয়নকে ধরাশায়ী করে রেখেছে? আর এখানেই যত সমস্যা কিংবা না পাওয়ার বেদনা তথা পর্যটন উন্নয়নের ব্যর্থতা।
পর্যটনের ঘাটতি হচ্ছে এর সার্বিক উন্নয়নে আশানুরূপ ফল না পাওয়া। যেমনটি অভ্যন্তরীণ কিছুটা হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের পর্যটন তার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ধারে-কাছেও যেতে পারেনি। তাই অর্জিত হয়নি আশানুরূপ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দারিদ্রদূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। তবে এটাও ঠিক যে, এসব অর্জনের জন্য যে সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা দরকার তাও আমরা কখনও করতে পারিনি। এতেকরে পর্যটন সব সময়ই চলেছে লক্ষ্যহীনভাবে। তাই, ব্যর্থতার পাল্লাও ভারী হয়েছে ক্রমাগতভাবে। এসব ব্যর্থতার পেছনে কাজ করেছে এই শিল্পের উভয় খাত অর্থাৎ সরকারি এবং বেসরকারি খাতের ব্যর্থতা। তারপরও পর্যটন শিল্পের যা কিছু উন্নতি হয়েছে তার প্রায় সবটুকুই বেসরকারী খাতের একক প্রচেষ্টার ফসল। যার প্রমাণ মেলে প্রান্তিকে অর্থাৎ গ্রামে-গঞ্জে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, মানসম্পন্ন রেস্তোরাঁ, বিনোদন কেন্দ্র, পার্ক, থিম পার্ক, ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারী ইত্যাদির উপস্থিতি থেকে।
এতকিছুর পরও পর্যটন শিল্পের অভিভাবক হিসেবে সরকারি খাতের ব্যর্থতাগুলো স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে খুব একটা পরিশ্রম করতে হয়না। দূরের নয় বরং পার্শ্ববর্তী এমন দেশগুলো যারা আমাদের চেয়ে অনেক পরে এবং পেছনে থেকে তাদের পর্যটন উন্নয়নের যাত্রা শুরু করে আশাতীত সাফল্য পেয়েছে সেসব দেশের সাথে তুলনা করলে আমাদের ব্যর্থতাগুলো দৃশ্যমান হয় এবং শুধু পীড়া দেয়। কেন না এত বছর পরও আমরা পর্যটনের জন্য একটি পৃথক ও শক্তিশালী মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করতে পারিনি। বিশ্বজনীনভাবে পর্যটন শিল্পের রয়েছে চারটি প্রধান খাত অর্থাৎ যানবাহন, আবাসন, খাবার ও পানীয় এবং বিনোদন। তার মধ্যে যানবাহনের অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে আকাশ, স্থল এবং জলযান। সেখান থেকে আকাশ পথের যান অর্থাৎ বেসামারিক বিমান পরিবহনের নামে মন্ত্রণালয় গঠন করে তারই লেজের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে পর্যটনকে। এ থেকেই প্রমাণিত হয় পর্যটন শিল্প সম্পর্কে আমাদের দীনতা ও অজ্ঞতা এবং এর সামগ্রীক উন্নয়নে ব্যর্থতার মাত্রা কতটুকু।
বাস্তবতার নিরিখে বলা যায় পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নিজের বলতে কিছুই থাকে না বিধায় বিশাল ও বিস্তৃত এই শিল্পের উন্নয়নের জন্য তাকে অর্থ, ভূমি, বন ও পরিবেশ, সংস্কৃতি, স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্থানীয় সরকার, পররাষ্ট্র, পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইত্যাদি প্রায় কোন না কোন মন্ত্রণালয়ের উপর নির্ভর করতেই হয়। কেন না সাধারণ অবকাঠামো বলি আর পর্যটন অবকাঠামো বলি এসবের উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন পণ্য ও সেবার মান বৃদ্ধি করে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তা বিক্রি করার জন্য কতকিছুরই না দরকার হয়। তাই এসব মন্ত্রণালয়কে উন্নয়ন সহযোগী বা সাথী করে সুষ্টুভাবে কাজ করা শুধুমাত্র একজন মাননীয় পর্যটন মন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব হয় না বিধায় পৃথিবীর কোনো দেশেই রাষ্ট্রপতিএবং বিশেষ করে সরকার প্রধানের নেতৃত্ব ও পৃষ্টপোষকতা ছাড়া পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব হয় নি এবং হবেও না। অথচ সুযোগ থাকার পরও আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি।
পর্যটনের জন্য থাকা চাই একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো। যার অন্তর্ভূক্ত থাকবে একটি যথার্থ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যা কি না সরকারি এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরী করবে। অথচ সেই পুরাতন “বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন”কে এতদিন সাক্ষী গোপাল বানিয়ে রেখে এখন আবার এটিকে ফোকলা করা হয়েছে। অর্থাৎ যা কিছু করার ক্ষমতা তার ছিল তা কেড়ে নিয়ে নবগঠিত “বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড” এর পাকস্থলিতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। এতেকরে জনবল, সম্পদ, অভিজ্ঞতা সবই রয়েগেছে পর্যটন করপোরেশনের কাছে আর প্রায় সকল ক্ষমতা চলেগেছে পর্যটন বোর্ডের কাছে। আবার পর্যটন বোর্ডের না আছে জনবল, অভিজ্ঞতা ও সম্পদ আর না আছে স্ব-স্বাধীনতা। ফলশ্রুতিতে কাজের কাজ কিছু না হলেও চরদখলের মত পদ তথা ক্ষমতা দখলে আমলারা জয়ী হতে পেরেছেন। এতেকরে পর্যটন শিল্পটি বেসরকারি খাতের আরো নাগালের বাইরে চলে গেছে।
আবার এই কারসাজি এক সময় খোলাসা হবার পর চতুর আমলারা “বাংলাদেশ পর্যটন কপপোরেশন অধ্যাদেশ - ১৯৭২” সংশোধনীর নামে “২০২২ সালের ১১ নং আইন” দ্বারা যা করেছেন তা অনেকটা তুঘলকি কাণ্ডের মত একটা কিছু বলা চলে। পর্যটনের ফায়দা কি হবে তা বিবেচনায় না নিয়ে তারা নিজেদের জন্য আরো কর্মক্ষেত্র ও পদপদবীর বেজায় ইন্তেজাম করেছেন ঠিকই। যেমন পর্যটন করপোরেশনে একজন চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন পরিচালক নিয়ে বিদ্যমান যে “পরিচালক পর্ষদ” রয়েছে সেটিকে বহাল রেখেই নতুন একজন প্রেসিডেন্টকে প্রধান করে আরেকটি “পরিচালক পর্ষদ” সৃষ্টি করা হয়েছে। যেখানে আরো অন্তত আটজন যুগ্ম-সচিব অন্তর্ভূক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
অবশ্য ছেলে ভূলানোর মত এর সাথে বেসরকারি খাত থেকেও সরকারের পছন্দের দুজন ভাগ্যমান বিশিষ্টজন অন্তর্ভূক্ত থেকে প্রক্সি দেয়ার সুবন্দোবস্ত রয়েছে। তারপরও পর্যটন করপোরেশন তার মহানুভবতা দেখাতে কার্পন্য করেনি। এর সাথে নিদেনপক্ষে তিন এবং সর্বাধিক সাত বিশিষ্টজন নিয়ে একটি “পর্যটন উপদেষ্ঠা কমিটি”ও থাকছে। এবার বলুন তো প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়, পর্যটন করপোরেশন এবং পর্যটন বোর্ডে এত এত খেদমতগার থাকার পরও আবার আইন সংশোধন করে হলেও পর্যটনকে কিন্তু কোন ফায়দা না দিয়েই আবার পর্যটন করপোরেশনে আরো বিরাট সংখ্যার খেদমতগার অন্তর্ভুক্তির এই যে ভার তা কি জীর্ন ও দুর্বল পর্যটন নিতে পারবে? তাছাড়াও প্রশ্ন থাকে এর প্রয়োজনীয়তাইবা কী?
এভাবেই আমলাদের ভারে নুব্জ্যমান আর অগোছালো প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েই চলছে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প। যেখানে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় তার প্রয়োজন মত পর্যটন করপোরেশন এবং পর্যটন বোর্ডকে ব্যবহার করছে ঠিকই কিন্তু সবকিছুই থেকে যাচ্ছে লক্ষ্যহীন আর দায়দায়িত্বহীন। অর্থাৎ সবকিছু চলছে অব্যবস্থাপনাকে সাথে নিয়ে পরিকল্পনাবিহীনভাবে এবং ইচ্ছেমাফিকভাবে। আর এই চর্চার দায়ভাগ নিয়ে আজ পর্যন্ত গদিনসীন সবগুলো সরকারকেই বিদায় নিতে হয়েছে বা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে কোন কাজেরই কোন ধারাবাহিকতা থাকছে না এবং আশানুরূপ কোন ফলও পাওয়া যাচ্ছে না। একেকটি সরকার এসে আগের সরকারের কাজকে পাশ কাটিয়ে আমলাদের দেয়া তাবিজ গলায় ঝুঁলিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মত পর্যটন উন্নয়নে ব্রতি দেখানোর চেষ্টা করছে। এতেকরে যেমনি একদিকে কোন কাজেরই ধারাবাহিকতা থাকছেনা তেমনি অন্যদিকে পর্যটন নীতিমালায় যাই থাকুক তা বাস্তবায়ন হচ্ছেনা; আবার পর্যটনকে শিল্প ঘোষণায় যাই থাকুক শিল্প সহায়ক সুবিধা প্রদানেরও কোনো উদ্যোগ থাকছেনা।
পর্যটন শিল্পের সুষ্টু ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য চাই প্রয়োজনীয় আইন। তাও আমাদের পর্যাপ্ত নেই; এমন কি বহু চেষ্টার পরও একক পর্যটন আইনটিকে শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আবার বহু বছর চিল্লাপাল্লার পর হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ট্র্যাভেল এজেন্সি আইনের মত বহু পুরাতন আইনগুলো যুগোপযোগী করতে গিয়ে অভিজ্ঞজনের মতামত এবং আন্তর্জাতিকতার ধার না ধেরে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে আরো লেজেগোবরে করা হয়েছে। যেমনটি আজ পর্যন্ত হোটেল ও রেস্তোরাঁ শ্রেণীকরণকে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে কিংবা সকল প্রকার আবাসন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধীকরণ ও শ্রেণীকরণ জটিলতার নিরসন করতে না পারার ফলে পর্যটন সেবার নিবন্ধীকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণে “মান সম্পন্ন পর্যটন সেবা” বা কিউটিএস পদ্ধতির প্রবর্তন করা সম্ভব হয়ে উঠছেনা।
অন্যদিকে কয়েক দশকের দোয়া-তাবিজ আর প্রত্যাশা পূরণের দাবী ও তদবীরের পর শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে “বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইড (নিবন্ধন ও পরিচালন) আইন” আলোর মুখ দেখলেও আইনটির বেশকিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় আইনটির যুগোপযোগীতা তথা আধুনিকায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও লিখিত পরামর্শ দেয়ার পরও আইন প্রণেতারা তাতে কর্ণপাত করেন নি। যার খেসারত ইতোমধ্যে দিতে হচ্ছে বলে আইনটির জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা জারি করা হয়েছে আরো দুই বছর পর অর্থাৎ ২০২৪ সালে। তারপরও এখন পর্যন্ত অর্থাৎ ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসেও তেমন একটা সাড়া মিলছেনা। এতেকরে ট্যুর অপারেটরদের সাথে সরাসরি আইনি সম্পর্ক বলতে যা বুঝায় তার সুরাহা হয়েও হচ্ছেনা বিধায় একদিকে সেবা প্রদানের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে পর্যটক বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
অভ্যন্তরীণ বলি আর আন্তর্জাতিক বলি পর্যটকদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে পর্যটক গন্তব্য তথা আকর্ষণগুলো। এগুলো চিহ্নিতকরণ, সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং সর্বশেষ বিপণনই হচ্ছে পর্যটন শিল্পের মূল শক্তি। অথচ একাজে আমরা সব সময়েই দুর্বল এবং নীরব কারণ প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব এজন্য অনেকটাই দায়ী বটে। তবে বহু বছরের দাবীর বিপরীতে ইদানীং সামান্য পরিমান বাজেট বরাদ্দ হওয়ার পরও তা শুধুমাত্র পরিকল্পনার অভাবে কাজে লাগানো যায় নি। উপরন্তু কিছু মতলববাজের পাল্লায় পড়ে পর্যটন পণ্য আর সেবার মান উন্নয়ন না করেই শুধু বিদেশ সফরের মওকাকে কাজে লাগানোর জন্য লক্ষ্যহীনভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় অংশগ্রহণ কিন্ত চলছেই। এতে প্রাপ্তির হিসাব না থাকায় অর্থের অপচয় অনেকটাই নিশ্চিত যা কাম্য হতে পারে না।
তবে এটাও সত্য যে, পর্যটন থেকে প্রাপ্তির নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়ার কোনো সুযোগ এখন পর্যন্ত আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। পারিনি পর্যটক আগমন ও নির্গমনের সঠিক সংখ্যা নিরূপনের কোনো ব্যবস্থা করতে। গোটা দুনিয়ায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট (টি এস এ) ব্যবহার করে তাবৎ পর্যটন পরিসংখ্যান এমন কি জিডিপি-তে পর্যটনের অবদান ইত্যকার সবকিছুই এখন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। অথচ এ কাজটি না করতে পারায় পর্যটন পরিসংখ্যান নিয়ে আমরা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এখনো অন্ধকারে। দূরের নয় পাশের দেশগুলোও তাদের প্রতিদিনের পর্যটক আগমন-নির্গমন বিষয়ে অবগত এবং বছরান্তে পর্যটনের সকল হিসাব-নিকাশ প্রকাশে অত্যন্ত পারঙ্গম। অথচ এত বছর পরও প্রতিদিনের থাক অন্তত প্রতি বছরের পর্যটন পরিসংখ্যানটা না দিতে পারাই বলে দেয় আমাদের গোটা পর্যটন শিল্প কিভাবে গোঁজামিল দিয়ে চলছে।
শুধু কি তাই; পর্যটনের মত এত বিশাল ও বিস্তৃত একটি শিল্প এত বছর ধরে চলছে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই। অথচ এজন্য থাকার কথা পর্যটনের যাবতীয় তথ্য-উপাত্তসহ “জাতীয় পর্যটন তথ্য ভাণ্ডার” বা ন্যাশনাল ট্যুরিজম ডাটা বেস। যা না থাকলে সঠিক শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ, অধ্যয়ন, গবেষণা, প্রচার-প্রচারণা, লেখালেখি, সংবাদ প্রচার এমন কি মানসম্পন্ন পযর্টন পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করা তথা সুষ্টুভাবে ব্যবসা পরিচালনাও সম্ভব হয় না। আবার নেই ন্যুনতম কোন গবেষণা কার্যক্রম যা নাহলে এত বিশাল ও বিস্তৃত একটি শিল্প চলতেই পারেনা। যেজন্য বলা হয় যে দেশের পর্যটন গবেষণা যত উন্নত সেদেশের পর্যটন তত উন্নত। অবশ্য এসবের ঘাটতি থেকেই আমাদের পর্যটন চলছে কোন পরিকল্পনা ছাড়া অব্যবস্থাপনাকে সাথে নিয়ে। আবার পরিকল্পনা না থাকার কারণে পর্যটনের জন্য কখনো কোন বাজেট বরাদ্দের ন্যায্য দাবী করতে না পারায় অর্থের অভাবে সার্বিক পর্যটন উন্নয়নে তেমন কোন কার্যক্রম প্রায় নাই বললেই চলে।
আমাদের পর্যটনের মূল যে শক্তি অর্থাৎ পর্যটন সম্পদের পর্যাপ্ততা এবং মানব সম্পদের সহজলভ্যতা তা কাজে লাগানোর জন্য পর্যটন পণ্যের উন্নয়ন, প্রচার ও প্রসারে একদিকে যেমনি সঠিক পরিকল্পনা দরকার অন্যদিকে তেমনি মান সম্পন্ন ও দক্ষ জনশক্তি অত্যাবশ্যকীয় বটে। কিন্তু এদুটি বিষয় এবং বিশেষ করে পরিকল্পনা একেবারেই নাজুক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তবে মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানিক দিক থেকে অনেকটা সুখবর থাকলেও মানের দিক থেকে এগুলো বেশ পিছিয়ে আছে। তাই চাকুরীর যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও একদিকে প্রশিক্ষণার্থীদের বেকার থাকতে হচ্ছে আবার অন্যদিকে সেই ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশ থেকে দক্ষ লোকবল নিয়ে আসতে হচ্ছে বিধায় দেশ মোটা অংকের বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে। এজন্য ছাত্র, শিক্ষক, কতৃপক্ষ এবং চাকুরীদাতা এদের মধ্যেকার বিরাজিত সমস্যা চিহ্নিত করে তা নিরসন, চাকুরী নিশ্চিতকরণ, সার্বিক সমন্বয় সাধন, পাঠ্যসূচী প্রণয়ন, ন্যাশনাল সার্টিফিকেশন ইত্যাদি কাজের জন্য সরকারি কোন বিভাগ বা কতৃপক্ষ না থাকায় সবকিছু জটপাকিয়ে আছে।
অপরদিকে পর্যটন উন্নয়নের পূর্ব শর্ত যে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা তা কার্যত অনুপস্থিত থাকায় বিভিন্ন সময়ে যতটুকুইবা কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে তা এক কথায় বিফলে গেছে। এই উপলব্দি থেকেই তা পুষিয়ে নিতে ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মত একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেও এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
তাই বহু বছরের দাবী ও প্রত্যাশা পূরণকল্পে পরবর্তীতে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভারত ও ফ্রান্সের একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান “আই পি গ্লোবাল” পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব পায়। তবে, তারা কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং বিশেষ করে বেসরকারি খাতের পক্ষ খেকে নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করে বিষয়টি সার্বিকভাবে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। ঐ কমিটির তদন্তে খসড়া মহাপরিকল্পনাটির ব্যাপক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতি ধরা পড়ায় পরামর্শ দেয়া হয় এক: দায়িত্বে থাকা আই পি গ্লোবাল এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে চুক্তি মোতাবেক কাজটি সম্পন্ন করবে অখবা দুই: আই পি গ্লোবাল ব্যর্থ হলে তা দেশের অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের লোকবল দ্বারা সম্পন্ন করতে হবে।
অথচ কোন এক অদৃশ্য কারণে এবং বিশেষ করে প্রশাসনের লোকজন তথা আমলাদের গড়িমসিতে ২০২৪ সালে গদিনসীন সরকারের ক্ষমতা হারানো পর্যন্ত এসব পরামর্শের কোনটিই আমলে নেয়া হয়নি। উপরন্তু প্রশাসনের লোকজন নিজেরাই এটি ঘষামাজা করে এবং চতুরতার আশ্রয় নিয়ে শুধু বিগত ক্ষমতা হারানো সরকারই নয় পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়েও অনুমোদন করানোর জন্য নানা ফন্দিফিকির চালিয়ে ব্যর্থ হয়। শেষতক এই ২০২৬ সালে এসে নতুন নির্বাচিত সরকারের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এটির একটি দফারফা তথা হিল্লা করার কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। এজন্য ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে মহান জাতীয় সংসদে এবং মাননীয় পর্যটন মন্ত্রীকে দিয়ে সংসদের বাইরে এই ভঙ্গুর তথা পঙ্গু মহাপরিকল্পনাটির মহা সাফাই গাওয়ানোর কাজ সমাপ্ত হয়েছে। তার সাথে তড়িঘড়ি করে ঘষামাজার মাধ্যমে মৃতপ্রায় জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলকে সক্রিয় করার কাজও শেষ হয়ে গেছে। তার শানে নুযূল হচ্ছে এখন যেকোন সময়ে এবং কোন এক দুর্বল মুহুর্তে এই নতুন সরকারকে দিয়ে মহাসংকটে থাকা ভঙ্গুর মহাপরিকল্পনাটিঅনুমোদন করিয়ে নেয়া হবে।
তার অর্থ দাঁড়াবে একটি বিকলাঙ্গ পর্যটন মহাপরিকল্পনা ভূমিষ্ট হবে। এতে আমলাদের জয় হবে, পর্যটনের পরাজয় হবে আর নাদান প্রায় সরকারকে অজ্ঞতার খেসারত হিসেবে সব ব্যর্থতার দায়ভাগ নিতে হবে। তার সাথে রাষ্ট্র তথা জনগনের প্রায় ত্রিশ কোটি টাকা তথা অর্থ এবং সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের অগ্রযাত্রা বিলম্বিত হওয়া তথা মুল্যবান সময় এই দুটোই নির্ঘাত জলে যাবে। এতেকরে এই অসহায় ও অবহেলিত পর্যটন শিল্পকে আবারো পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা ছাড়াই লেঙড়া-লোংড়া অবস্থায় দিন কাটাতে হবে। অথচ এতসব কিছু পরিহার করার জন্য বিকল্প পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়ে অর্থ, সময়, বিড়ম্বনা এবং পর্যটনের ক্ষতি সবই রক্ষার পাশাপাশি পর্যটনের জন্য জরুরী ভিত্তিতে যা করা দরকার এমন একটা কিছু করা যেতো। এজন্য পর্যটন নিয়ে আমাদের মত সমস্যাসঙ্কুল অবস্থার মধ্যে আছে বিশ্বের এমন দেশগুলোকে অনুসরণ করে সেকেলে, দীর্ঘমেয়াদের এবং বাস্তবায়নে সমস্যায় পড়তে হয় এমন একটি পর্যটন মহাপরিকল্পনার পরিবর্তে মাএ তিন-চার বছরের জন্য “কৌশলগত পর্যটন পরিকল্পনা” বা স্ট্রেটেজিক ট্যুরিজম প্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাই উত্তম হতো। অথচ এজন্য দেয়া পরামর্শ আমলে নিলে দূরে নয় আমাদের কাছের দেশ শ্রীলঙ্কাকে অনুসরণ করলেই আর কিছু লাগতোনা।
এসব থেকেই পরিষ্কার পর্যটনের জন্য পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও তা যেনো আমরা আমলেই নিতে চাইনা। অথচ আধুনিক পর্যটন শিল্পে পর্যটকরা যে আকর্ষণকে সামনে রেখে কোনো একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে গমন করেন শুধু সেটি নয় বরং ঐ গন্তব্যে তারা যেসব কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন, যেসব সেবা গ্রহণ করেন এবং শেষতক যে সন্তোষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরেন তার সমষ্টিই হচ্ছে পর্যটন পণ্য। কেন না এসবের জন্য পর্যটকরা তাদের পকেটের টাকা খরচ করেন যা কি না পর্যটন শিল্পের আয়ের উৎস। তাই এসব বিষয়ের পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যথাযথ প্রচার-প্রচারণা তথা বিপণন ছাড়া পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব নয়। অতএব এসব বিষয়কে প্রাধান্য না দিয়ে শুধু শুধু কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, শ্রীমঙ্গল, সিলেট, টাঙ্গুয়ার হাওর, নেত্রকোনা, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, ওয়ারি বটেশ্বর, ষাটগম্বুজ মসজিদ, জাতীয় সংসদ ভবন ইত্যাদি স্থান আর স্থাপনা নিয়ে স্রেফ বড়াই করলেই তো আর চলেনা।
যাহোক, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বয়স যেমনি অনেক বছর তেমনি সমস্যাও বিস্তর। তাই এর মধ্যে যেগুলো মোটা দাগের এবং অনেকটা প্রথম সারির সেগুলো নিয়ে হয়তো আমরা আলোচনা করলাম। তবে সবগুলো সমস্যা এবং এগুলোর নিরসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও একটি উপমা দিয়ে শেষ করা যায়। আমরা জানি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অত্যাধুনিক ভবন তৈরী করতে হলে প্রথমেই সঙ্গতি মাফিক পরিকল্পনার দরকার হয়। আর তা বাস্তবায়নের জন্য নকশা প্রণয়নের পর এরই ভিত্তিতে কাঠামো তৈরীর জন্য ইট, বালু, সিমেন্ট, রড, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, গ্যাস ও পানির সংযোগ সরঞ্জাম, স্যানিটারি সামগ্রী ইত্যাদি ব্যবহার শেষে দরজা জানালা স্থাপনের কাজ করা হয়। তারপর ভিতরের নকশা মোতাবেক আসবাবপত্র, ঘর সাজানোর উপকরন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা সম্বলিত যাবতীয়কাজ শেষ করার সাথে সাথে বহিরাঙ্গনেও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়।
কিন্তু যদি তা এভাবে পরিকল্পনা বা নিয়মমাফিক না করে বিভিন্ন জন বিভিন্ন সময়ে তাদের ইচ্ছে মত এসব নির্মান সামগ্রী ও সরঞ্জামাদী ইত্যাদির কিছুটা ব্যবস্থা করেও থাকেন তবুও পরিকল্পিতভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভবন তৈরী করা যাবে না। তবে অনেকের পক্ষে এমন ভবন তৈরীতে নিজেদের অবদান রাখার গল্প বলার সুযোগ যে হবে তাও আবার অস্বীকার করা যাবে না। ঠিক তেমনি আমাদের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে গদিনসীন সরকারগুলো তাদের পছন্দমত কিছু করে অবদান রেখেছেন বা রাখছেন সেই দাবী করতে পারবেন এবং তা কেউ অস্বীকারও করতে পারবেনা। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের যথার্থ উন্নয়ন হয়েছে বা হচ্ছে তা বলা যাবে না। তাই, যতদিন পর্যন্ত গদিনসীন সরকারগুলো আন্তরিক না হবে এবং তার সাথে “আমলাতন্ত্রের ইচ্ছায় নয় বরং পর্যটনের নিয়মের মধ্যে থেকে পরিকল্পনামাফিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উন্নয়ন কাজ করতে হবে” মর্মে উপলব্দি না করবে ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হবে না।
লেখকঃ চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ট্যুরিজম স্টাডিজ (সিটিএস)।
