পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রাশিয়া সফর: বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সন্ধান

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রাশিয়া সফর: বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সন্ধান

ফন্ট সাইজ:

২০২৪ সালের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের গতিপথ প্রমাণ করে যে এই অংশীদারিত্ব ক্রমশ দলীয় রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও কাঠামোগত স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যদিও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হওয়ার পর মস্কো দ্রুত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং চলমান অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পসমূহের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার মাধ্যমে রাশিয়া স্পষ্ট বার্তা দেয় যে বাংলাদেশে তার স্বার্থ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্যভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা দেখায় যে নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশে তার কৌশলগত উপস্থিতি ও প্রভাব বজায় রাখতে মস্কো আগ্রহী। এই অভিযোজনক্ষমতা এ বিষয়টিকেই প্রতিফলিত করে যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখন ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সম্পন্ন একটি অংশীদার, এবং দুই দেশের সম্পর্ক এমন এক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা সাময়িক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন রাশিয়া সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা মধ্যম ও উদীয়মান শক্তিগুলোর জন্য যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনি নতুন সুযোগও সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের জন্য এই সফর কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং জাতীয় উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের স্বার্থে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকল্প সম্প্রসারণের একটি প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশ–রাশিয়া সম্পর্কের গতিপথকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়—অন্টোলজিক্যাল সিকিউরিটি থিওরি এবং নিওক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম । এই দুই তত্ত্ব একসঙ্গে ব্যাখ্যা করে কেন বাংলাদেশ রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান ও চীনের সঙ্গেও শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখে।

অন্টোলজিক্যাল সিকিউরিটি তত্ত্ব অনুসারে, রাষ্ট্র শুধু সামরিক বা ভৌত নিরাপত্তাই চায় না; বরং তারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ধারাবাহিকতা, আস্থা, পরিচয় ও পূর্বানুমানযোগ্য সম্পর্কও খোঁজে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদ ব্রেন্ট জে. স্টিল এবং জেনিফার মিটজেন দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তাবোধ ও আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের শিকড় নিহিত রয়েছে স্বাধীনতার ইতিহাসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল প্রথমদিকের প্রধান শক্তিগুলোর একটি, যারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণে সোভিয়েত সহায়তা এবং নবীন রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে যে আস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা আজও দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশি গবেষক সিদ্দিকী ও আজিমের গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, এই ঐতিহাসিক স্মৃতি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে। শীতল যুদ্ধের অবসান, একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থান এবং বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতা—এসব পরিবর্তনের পরও বাংলাদেশ ও রাশিয়া তাদের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়; বরং দীর্ঘদিনের আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক প্রত্যাশার প্রতিফলন।

তবে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক আস্থা বর্তমান বাংলাদেশ–রাশিয়া সম্পর্কের ব্যাখ্যা দেয় না। এ ক্ষেত্রে নিওক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম আরও কার্যকর ব্যাখ্যা প্রদান করে। এই তত্ত্বের প্রবক্তা গিডিয়ন রোজ যুক্তি দেন যে, রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের প্রতি যান্ত্রিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় না; বরং অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন চাহিদা, নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বাংলাদেশের রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ ঠিক এই বাস্তববাদী যুক্তিরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে জোট গড়তে চায় না কিংবা কোনো ভূরাজনৈতিক ব্লকের অংশ হতে চায় না। বরং জাতীয় উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং কৌশলগত নমনীয়তা নিশ্চিত করার জন্য বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। রূপপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ রাশিয়াকে বেছে নিয়েছিল মূলত প্রযুক্তি, অর্থায়ন, দক্ষতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে, যা দেশের জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

একই বাস্তববাদী যুক্তি বাংলাদেশের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রয়েছে বিস্তৃত বাণিজ্যিক সম্পর্ক। ভারতের সঙ্গে রয়েছে সংযোগ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এমন একটি বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় “মাল্টি-ভেক্টর ফরেন পলিসি” বা “হেজিং স্ট্র্যাটেজি” বলা হয়।

আসন্ন রাশিয়া সফর বাংলাদেশ–রাশিয়া সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। জ্বালানি খাত তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুর প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের পাশাপাশি পারমাণবিক প্রযুক্তি শিক্ষা, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়ন, জ্বালানি গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতেও সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গম ও সার রপ্তানিকারক দেশ। দীর্ঘমেয়াদি সার সরবরাহ চুক্তি, কৃষি গবেষণা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সহযোগিতা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।

বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প, তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্য ও সিরামিক শিল্পের জন্য রাশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। একইসঙ্গে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সার ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়তে পারে।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়ে আসছে। বৃত্তি বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে গবেষণা সহযোগিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় যৌথ কর্মসূচি বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রযুক্তি সহযোগিতাও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা বহন করে। পারমাণবিক প্রকৌশল, মহাকাশ প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণে রাশিয়ার দক্ষতা বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর এবং শিল্প আধুনিকায়নে অবদান রাখতে পারে।

জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং শান্তিরক্ষা মিশনে সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে সহায়ক হতে পারে। তবে এ ধরনের সহযোগিতা হবে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ, যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা উৎস বৈচিত্র্যকরণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং অন্টোলজিক্যাল সিকিউরিটি এবং নিওক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম—উভয় তত্ত্বই ইঙ্গিত করে যে, একটি রাষ্ট্র তার স্বায়ত্তশাসন ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে একাধিক শক্তির সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি অপরিহার্য অংশীদার। একইভাবে ইউরোপ, ভারত, জাপান ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।

বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও এই কৌশলকে সমর্থন করে। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় অনেক উদীয়মান অর্থনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার পরিবর্তে সবার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পথ বেছে নিচ্ছে। এর ফলে তারা অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত ঝুঁকি হ্রাস করতে পারছে। অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কৌশলগত স্বাধীনতা ভোগ করছে। এই স্বাধীনতা কোনো পক্ষ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা।

রাশিয়ার জন্য বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা প্রদান করে। বাংলাদেশ ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের একটি স্থিতিশীল ও ক্রমবর্ধমান বাজার, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপস্থিতি নিশ্চিত করে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক রাজনীতিতে অধিকতর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনে আগ্রহী উদীয়মান মধ্যম শক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রাশিয়ার জন্য একটি মূল্যবান কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, রাশিয়ায় ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকট বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন সৃষ্টি করেছে, যা বাংলাদেশি শ্রমশক্তির জন্য নতুন সুযোগ উন্মুক্ত করছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান ও শিক্ষার ভিসা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়া দুই দেশের জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ ও সম্পর্কের প্রতিফলন। যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক পাচার এবং কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের সামরিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন, সামগ্রিক প্রবণতা শিক্ষা, পেশাগত এবং সামাজিক বিনিময় বৃদ্ধির দিকেই ইঙ্গিত করে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক ভবিষ্যতেও স্থিতিশীল ও টেকসই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ এটি ক্রমেই দলীয় রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তে পারস্পরিক জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে। এই অংশীদারিত্ব তিনটি স্থায়ী স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: পারমাণবিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা, শস্য ও সার বাণিজ্যের মাধ্যমে খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তা, এবং শিক্ষা, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন। অন্টোলজিক্যাল সিকিউরিটি তত্ত্ব এবং নব্য-ধ্রুপদী বাস্তববাদ -এর আলোকে বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম কৌশল হলো কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে একচেটিয়া জোটে আবদ্ধ হওয়া বা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রধান শক্তির সঙ্গে গঠনমূলক অংশীদারিত্ব বজায় রেখে একটি মাল্টি-ভেক্টর বা বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। এ ধরনের নীতি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে আরও সুসংহত করবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন