জাতিসংঘের সতর্কবার্তা: আসন্ন এল নিনোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কি প্রস্তুত?

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা: আসন্ন এল নিনোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কি প্রস্তুত?

ফন্ট সাইজ:

পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে একটি নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের নির্মম বাস্তবতা। প্রতিদিন বিশ্বের কোথাও না কোথাও দাবদাহে মানুষ মারা যাচ্ছে, কোথাও নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে জনপদ। এমন এক সময়ে জাতিসংঘের অধীন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) নতুন সতর্কবার্তা বিশ্ববাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পৃথিবী নতুন একটি এল নিনো পর্বে প্রবেশ করতে পারে, যা ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে আরও শক্তিশালী হয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং খাদ্য সংকটকে তীব্রতর করতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, জলবায়ু ঝুঁকির শীর্ষে থাকা বাংলাদেশ কি এই নতুন সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুত?

এল নিনো কোনো নতুন ঘটনা নয়। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আজকের পৃথিবী আর কয়েক দশক আগের পৃথিবী এক নয়। শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির নির্বিচার ব্যবহার এবং বন উজাড়ের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনা এখন বহুগুণ বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে।

ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাউলোর ভাষায়, এটি আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
২০২৩-২৪ সালের এল নিনো পৃথিবীকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরে পৌঁছে দিয়েছিল। এবার যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা আরও উদ্বেগজনক। কয়েকটি আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেল ইতোমধ্যে সম্ভাব্য "সুপার এল নিনো"-এর ইঙ্গিত দিয়েছে। যদিও এর তীব্রতা নিয়ে এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবুও বিজ্ঞানীরা একমত যে পৃথিবীর বহু অঞ্চলে এর প্রভাব হবে ব্যাপক।

বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অর্থনীতির কাঠামোর কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করে এমন দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে অসংখ্য নদীনির্ভর জীবনব্যবস্থা—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন আবহাওয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব সাধারণত দুটি রূপে দেখা যায়। প্রথমত, তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, বর্ষাকালের বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হয়। কখনো স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়, আবার কখনো স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়ে বন্যা সৃষ্টি করে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মানুষ যে তীব্র তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা এই বাস্তবতারই পূর্বাভাস। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে, শ্রমজীবী মানুষের কাজ ব্যাহত হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। যদি নতুন এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়, তবে এই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো কৃষি। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো অনেকাংশে কৃষিনির্ভর। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও ফল উৎপাদন সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।
ডব্লিউএমও ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া ফসল উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশেও একই ঝুঁকি বিদ্যমান।
এমনিতেই কৃষকরা নানা সংকটে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সার ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার ওপর যদি খরা বা অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ফসল উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশের কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করতে না পারলে ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতির ঝুঁকি বাড়বে। খরা সহনশীল ধানের জাত, আধুনিক সেচব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং কৃষি বীমা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
এল নিনোর আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো পানিসংকট। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ইতোমধ্যেই মৌসুমি খরার ঝুঁকিতে থাকে। যদি বৃষ্টিপাত কমে যায়, তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। এর ফলে পানির স্তর দ্রুত নেমে যেতে পারে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলেও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সতর্কবার্তায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে তাপজনিত অসুস্থতা, ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ পতঙ্গবাহিত রোগের বিস্তার ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা দেখেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশার বিস্তার এলাকা ও মৌসুম উভয়ই পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধির ঝুঁকি আগেই ছিল। এল নিনো সেই ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে মৎস্যসম্পদ ও উপকূলীয় কৃষি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশ্বে একটি প্রশংসিত মডেল তৈরি করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং কমিউনিটি পর্যায়ের সচেতনতা বৃদ্ধি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। এই অভিজ্ঞতাই এখন জলবায়ু অভিযোজনের নতুন ভিত্তি হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এল নিনো মোকাবিলা শুধুমাত্র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি, জ্বালানি, নগর পরিকল্পনা এবং অর্থনীতির সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। এজন্য জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাসকে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া, কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা, হাসপাতালগুলোকে তাপপ্রবাহজনিত রোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ দায়ী না হলেও আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় হতে হবে। ক্ষতিপূরণ তহবিল, জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রশ্নে উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে হবে। কারণ যেসব দেশ সবচেয়ে কম দূষণ করেছে, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আসন্ন এল নিনোর প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সতর্কবাণীকে তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক বিবৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বৈশ্বিক বিপদ সংকেত। তিনি বলেছেন, এল নিনো উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীতে আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করবে। সেই আগুনের উত্তাপ বাংলাদেশও অনুভব করবে।

ইতিহাস বলে, বাংলাদেশ সংকট মোকাবিলায় বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন যুগে শুধু সাহস যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী নীতি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। এল নিনো আসবে কি আসবে না, কতটা শক্তিশালী হবে—সেটি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি যে বাস্তব এবং ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং এল নিনোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতির বিকল্প নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন