বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে (ইভি) বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং ইভি’র ওপর উচ্চ কর-শুল্ক আরোপের ফলে সবুজ জ্বালানি খাত কৃত্রিমভাবে কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানিতে শুল্ক ছাড়ে অন্যায্য সুবিধা দেয়ার কারণে রাষ্ট্র বছরে ১ হাজার কোটি থেকে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব হারাচ্ছে।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এসব কথা বলেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
গবেষণা পরিচালক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সবুজ রাজস্ব নীতির দিকে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনও এমন একটি রাজস্ব কাঠামো অনুসরণ করছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানিকে সুবিধা দিচ্ছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পিছিয়ে রাখছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জ্বালানির মিশ্রণ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং পরিবহন খাতে জ্বালানি ব্যবহারের ওপর।
তিনি আরও বলেন, সিপিডি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ৫০টি পণ্য ও প্রযুক্তির ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর মোট করের হার ২৭ থেকে ২৮ শতাংশ। ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থায় এ হার ৬২ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত এবং ইলেকট্রিক গাড়ি, মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রে ৬১ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গ্রিড আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রান্সফরমার, কন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের ওপরও উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে এলএনজি’র মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর সামগ্রিক শুল্ক মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা একে তুলনামূলকভাবে সস্তা করে রেখেছে।
সিপিডি’র তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন বাজেটের ৯৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ বছরের পর বছর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে গেছে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো পেয়েছে ৫ শতাংশেরও কম বরাদ্দ।
অন্যদিকে, পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুতের (সোলার) সরঞ্জামের ওপর মোট করের হার প্রায় ৩১ শতাংশ এবং বায়ু বিদ্যুতের ওপর এই হার ২৯ শতাংশ। এলএনজি আমদানিতে যদি সৌর বিদ্যুতের সমপরিমাণ কর বা টিটিআই আরোপ করা হতো, তবে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতো ১ হাজার ২৯৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। একইভাবে যদি বায়ু বিদ্যুতের সমপরিমাণ কর আরোপ করা হতো, তবে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আসতো ১ হাজার ৫৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, জীবাশ্ম জ্বালানিকে এই অন্যায্য সুবিধা দিতে গিয়ে সরকার বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
সেমিনারে সিপিডি জানায়, এই রাজস্ব বৈষম্য ইউটিলিটি পর্যায়ের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ইভি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ফলে জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর বিলম্বিত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা ও ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ওপর কর-শুল্ক কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিদ্যমান সুবিধা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সিপিডি বলছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রাজস্ব বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। দেশি- বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সিপিডি বলছে, বৈষম্য থেকে বেরিয়ে এসে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির পথে যাত্রার এখনই সময়। সিপিডি বলছে, কুইক রেন্টাল আইনের অধীনে করা চুক্তিতে চলমান জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভর্তুকির পরিমাণও অনেক বেশি। এমনকি এ আইনের অধীনে তৈরি করা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দামও অনেক বেশি। উন্নয়ন বাজেটের ৯৫ শতাংশই পায় জীবাশ্ম জ্বালানি, নবায়নযোগ্য খাতে বরাদ্দ ৫ শতাংশের কম।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ প্রমুখ।
