অন্ধ নানার লাঠির শব্দে পথচলা, ঝাপসা চোখে আলিফার বেঁচে থাকার যুদ্ধ

অন্ধ নানার লাঠির শব্দে পথচলা, ঝাপসা চোখে আলিফার বেঁচে থাকার যুদ্ধ

ফন্ট সাইজ:

সকালের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই বেরিয়ে পড়েন তারা। হাতে পুরনো একটি লাঠি। ধীরে ধীরে ঠুকঠুক শব্দ তুলে সামনে এগোন জন্মান্ধ নানা আব্দুল সালাম। পাশে ছোট্ট একটি হাত শক্ত করে ধরে থাকে আট বছরের শিশু আলিফা। তার চোখেও পৃথিবীটা পরিষ্কার নয়, সবকিছুই ঝাপসা। তবু সেই ঝাপসা আলোই যেন তাদের পথ দেখায়। নাতনিকে নিয়ে আব্দুল সালাম কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের উদিবাড়ি মজমপুর এলাকার মনসুর শাহ মাজারের পাশে পগো ডাক্তারের বাড়ির একটি ছোট ঘরে ভাড়া থাকেন। আলিফা ঠিকমতো দেখতে পায় না। দূরের মানুষ, যানবাহন কিংবা দোকানের সাইনবোর্ড, সব একাকার হয়ে যায় তার চোখে। কিন্তু নানার হাত ছেড়ে দিলে যে চলবে না, তা সে ভালো করেই বোঝে। কারণ নানা কিছুই দেখতে পান না। তাই এই ছোট্ট মেয়েটিই এখন তার চোখ, তার ভরসা, তার পথপ্রদর্শক। প্রতিদিন সকাল থেকে তারা শহরের এক মোড় থেকে আরেক মোড়ে ঘুরে বেড়ান। কখনো বাসস্ট্যান্ডে, কখনো বাজারের সামনে। কেউ কয়েন দেয়, কেউ আবার দু-এক প্যাকেট খাবার তুলে দেয়। আবার অনেকেই মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। ভিক্ষা করে যা জোটে, তা দিয়েই কোনো রকমে দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা হয়। কখনো হয়, কখনো হয় না। যেদিন খাবার কম পড়ে, সেদিন আলিফা নানাকে বলে আমার ক্ষুধা নেই। অথচ তার ছোট্ট পেটটাও তখন খালি থাকে। খেলনা, স্কুলব্যাগ বা নতুন জামার মতো শিশুসুলভ স্বপ্নগুলো তার জীবনে যেন কেবল গল্পই হয়ে আছে। তার প্রতিটি দিন কাটে রাস্তায় হাঁটা, মানুষের করুণা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে। স্থানীয়রা জানান, আলিফার বাবা-মা দু’জনেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। তারা নাটোরে থাকেন এবং ভিক্ষা করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। ছোটবেলা থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আলিফা তার নানার সঙ্গেই থাকছে। জন্মান্ধ নানা অনেক আগেই তার স্ত্রীকে হারিয়েছেন। এখন নাতনিই তার একমাত্র সম্বল। আলিফার নানা জানান, জন্মান্ধ হওয়ার কারণে তিনি সারাজীবন কষ্ট করেই চলেছেন। এখন নাতনিকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয়। এত কষ্টের মধ্যেও আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা, ভাতা কিংবা চিকিৎসা সহায়তা তারা পাননি। শিশু আলিফা বলেন, আমারও ইচ্ছা হয় স্কুলে যেতে, আমার বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে, আমার চোখের চিকিৎসা করাতে, ঈদের দিন নতুন জামা কাপড় পরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে এবং বাবা মায়ের আদর নিতে, কিন্তু আমরা তো একেবারেই গরিব খেতেই পারি না ঈদে আবার নতুন জামা, স্কুল এগুলো আমার জন্য না। প্রশ্ন শুধু একটাই এই ছোট্ট মেয়েটির জীবনে কি কোনোদিন স্পষ্ট আলো ফুটবে না। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল লতিফ শেখ বলেন, আলিফা ও তার নানার বিষয়টি আগে আমাদের জানানো হয়নি। বিষয়টি আমরা খোঁজ নিয়ে দেখবো এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন