ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ফ্রান্স। মঙ্গলবার ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার জেরে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে বেজালেল ফ্রান্সে প্রবেশ করতে পারবে না। এ খবর দিয়েছে ফ্রান্স২৪। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন- বৃটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা বৃদ্ধির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। তিনি বলেন, স্মোট্রিচ খোলাখুলিভাবে পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। পশ্চিম তীরে নতুন বসতি স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গাজাকে পুনরায় উপনিবেশে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অর্থনৈতিক পতনকে উৎসাহিত করেছেন। এর ফলে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে, সেটিকেও সমর্থন করেছেন।
বারো আরও লিখেছেন, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এমন নীতি মেনে নিতে পারে না। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফ্রান্সে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া ইসরাইলি সরকারের দ্বিতীয় সদস্য হলো স্মোট্রিচ। এর আগে ২৩ মে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরকে ফ্রান্সে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। গাজার উদ্দেশে ত্রাণবাহী নৌযানে থাকা কর্মীদের ইসরাইলি সেনারা আটক করার পর তাদের নিয়ে উপহাস করায় তার বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়।
ফ্রান্স একই সঙ্গে বসতি স্থাপনকারী চারটি সংগঠনের নেতার ওপর এবং ২১ জন সহিংস বসতি স্থাপনকারীর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নরওয়ে জানিয়েছে, তারা ২৮ মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষিত নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করবে। পাশাপাশি ২০ জন সহিংস বসতি স্থাপনকারীর ওপর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। তবে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলায় অর্থায়ন ও সহায়তা দেয়া নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি বৃটেন দেশটির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ বিবেচিত ইসরাইলি বসতিগুলোতে আর্থিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার পার্লামেন্টে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে দখল করা জমি থেকে সহিংস বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোর লাভবান হওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, ইসরাইলি সরকার বসতি স্থাপনকারীদের কিছু সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে বটে। কিন্তু জবাবদিহির এত অভাবের মধ্যে সেই নিন্দা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
অন্যদিকে, ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত এই নিষেধাজ্ঞাগুলোকে লজ্জাজনক বলে আখ্যা দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমরস্টেইন বলেন, এই পদক্ষেপগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ইসরাইলের ভূমিতে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের অধিকারের বিষয়ে এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে একটি রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেয়া, যা সহিংসতা বিরোধী পদক্ষেপের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
গত বছরের জুন মাসেই বেন-গাভির ও স্মোট্রিচের বিরুদ্ধে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওই পাঁচটি দেশ। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। সে সময় ইসরাইলি সরকার এসব নিষেধাজ্ঞাকে কেলেঙ্কারিপূর্ণ বলে বর্ণনা করে। স্পেন, স্লোভেনিয়া এবং সর্বশেষ আয়ারল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশও এই দুই মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ২০২২ সালে স্মোট্রিচের কট্টর ডানপন্থী ধর্মীয় জায়নবাদী পার্টির সঙ্গে জোট গঠনের পর ইতামার বেন-গাভির মন্ত্রী হয়। ওই নির্বাচনে জোটটি তৃতীয় অবস্থানে ছিল। বেন-গাভির ও স্মোট্রিচ একসঙ্গে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট সরকারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের ইসরাইলে হামলার মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরেও প্রায় দিনই সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরাইলের দখলে রয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে কমপক্ষে ১ হাজার ৮০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সশস্ত্র যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষ উভয়ই রয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরাইলের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ফিলিস্তিনি হামলা অথবা ইসরাইলি সামরিক অভিযানের সময় কমপক্ষে ৪৬ জন ইসরাইলি নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্য উভয়ই রয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার জাতিসংঘের নির্দেশনায় পরিচালিত একটি তদন্তে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ ইসরাইলি বাহিনী, বসতি স্থাপনকারী এবং হামাসের কঠোর শাসনের গণনৃশংসতার মধ্যে আটকা পড়েছে।
