আজ সকালে ফ্রাঙ্কফুর্ট-প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক হাবিব বাবুল আমাকে ফোন করে অত্যন্ত হতাশাজনক একটি খবর জানালেন। তিনি বললেন, আসন্ন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় এবার সম্ভবত বাংলাদেশের কোনো সরকারি প্রতিনিধি থাকছে না! অথচ একসময় প্রবাসে বসে তারাই নিজ উদ্যোগে এই মেলায় বাংলা ভাষাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারকে এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চের সাথে যুক্ত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তার আক্ষেপভরা আশঙ্কা-সব কিছু ঠিক থাকার পরও এবারের বিশ্ববিখ্যাত এই বইমেলা হয়তো ‘বাংলাদেশবিহীন’ হতে যাচ্ছে।
আগামী ৭ থেকে ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই প্রকাশনা আসরে ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে ও সরকারি উদ্যোগে অংশ নিয়ে আসছে। এই অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার একটি ধারাবাহিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। জানা গেছে, এবারও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বার্লিনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস মেলার স্টল বুকিংয়ের কাজ সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের বিষয় হলো, এ বিষয়ে দূতাবাস থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো জবাব মেলেনি। মন্ত্রণালয়ের এই রহস্যময়, উদাসীন ও আত্মঘাতী নীরবতার কারণে দীর্ঘ এক যুগের একটি আন্তর্জাতিক ধারাবাহিকতা আজ খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের অনুধাবন করা উচিত যে, ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা সাধারণ কোনো বইয়ের দোকান বা কেবল বই প্রদর্শনের জায়গা নয়। এটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা শিল্পের ব্যবসায়িক যোগাযোগ, কপিরাইট বা অনুবাদ স্বত্ব বিনিময়, বিদেশি প্রকাশকদের সাথে নেটওয়ার্কিং এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির এক বিশাল বৈশ্বিক কেন্দ্র। এখানে একটি দেশের উপস্থিতির অর্থ হলো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সগর্বে তুলে ধরা এবং নতুন অংশীদারত্ব তৈরি করা।
এই মেলায় অংশ নিয়ে তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভ কী- এমন ভ্রান্ত প্রশাসনিক হিসাব-নিকাশ ও আমলাতান্ত্রিক গড়িমসিতে বাংলা সাহিত্যের বিশ্বায়নের সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করা চরম অবমাননাকর। অনুবাদ ও প্রকাশনা-চুক্তির যে আন্তর্জাতিক দরজাগুলো বাংলাদেশের জন্য ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছিল, মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তহীনতা সেই দরজাগুলো নিজেদের মুখের ওপরই সজোরে বন্ধ করে দিচ্ছে। তাছাড়া, স্টল বুকিং বাবদ যে সরকারি অর্থ ও শ্রম ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে, মেলায় অংশ না নিলে সেই আর্থিক দায়ভার কে নেবে সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
সময় এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। একটি রাষ্ট্রের সংস্কৃতি নীতি কখনোই আমলাতান্ত্রিক ফাইলে ধুলো জমতে পারে বৈদেশিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগের এই বিশাল সুযোগ কেন হেলায় হারানো হচ্ছে এবং কেন দূতাবাসের চিঠির জবাব দেওয়া হচ্ছে না-সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিৎ।
