অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলিং করায় খুন হন নিরঞ্জন

অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলিং করায় খুন হন নিরঞ্জন

ফন্ট সাইজ:

ময়মনসিংহে প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত শামীম মিয়া (৩৮)কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোপনে ধারণ করা আপত্তিকর ভিডিও দিয়ে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেইলিং করায় অটোরিকশা মালিক ও স্বর্ণ কারিগর নিরঞ্জন চন্দ্র সূত্রধর (৫০)কে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার শামীম মিয়া নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার জালাল মিয়ার ছেলে।

রোববার দুপুরে পিবিআই ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। পিবিআই জানায়, নিহত নিরঞ্জন ধরের খাগডহর এলাকায় চারটি অটোরিকশা ছিল। গ্রেপ্তার শামীম মিয়া সেই অটোরিকশার গ্যারেজ ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার সুবাদে দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্কের সূত্র ধরে নিরঞ্জন নিয়মিত শামীমের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন। একদিন শামীমের মা-বাবা বাসায় না থাকার সুযোগে শামীম এক নারীকে নিয়ে তার ঘরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। বিষয়টি টের পেয়ে নিরঞ্জন ধর গোপনে শামীমের অসতর্কতার সুযোগে সেই দৃশ্যের ভিডিও চিত্র নিজের মোবাইলে ধারণ করে রাখেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিও দেখিয়ে শামীমকে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করতে শুরু করেন নিরঞ্জন।

পুলিশ জানায়, গত ২১শে সেপ্টেম্বর বিকালে শামীমের খাগডহরের ভাড়া বাসায় যান নিরঞ্জন ধর। সেখানে তিনি পুনরায় শামীমের কাছে টাকা দাবি করলে দু’জনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে শামীম ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরে থাকা মসলা বাটার পাটার ভারী শিল দিয়ে নিরঞ্জনের মাথায় সজোরে আঘাত করে। আঘাত পেয়ে নিরঞ্জন মাটিতে পড়ে চিৎকার শুরু করলে শামীম তার মুখে কাপড় গুঁজে দেয় এবং ঘর থেকে বঁটি এনে মাথায় উপর্যুপরি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর আলামত গুম করতে মরদেহ একটি চটের বস্তায় ঢুকায় শামীম। এরপর তা ঘরের চালের ড্রামের ভেতর ভরে নিজের বাসাতেই রেখে দেয়। পরদিন ২২শে সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে একটি ইজিবাইক ভাড়া করে ড্রামটি নিয়ে বেগুনবাড়ী স্লুইস গেটের নির্জন খালের পানিতে ফেলে দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় শামীম।

অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানায়, ড্রামের ভেতর বস্তাবন্দি মরদেহের সঙ্গে থাকা প্যান্টের পকেটে ময়মনসিংহ হিন্দু কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের একটি টোকেন পাওয়া যায়। ওই টোকেনের সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করে নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরিচয় পাওয়ার পর নিহত ব্যক্তির স্ত্রী সুমিতা রানী সূত্রধর ও ছেলে জয় সূত্রধর মরদেহ শনাক্ত করেন।
নিরঞ্জন চন্দ্র সূত্রধর স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ময়মনসিংহ নগরের স্টেডিয়াম এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি জেলার ত্রিশাল উপজেলার বাসিন্দা। ২০শে সেপ্টেম্বর তিনি বাসা থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন ২১শে সেপ্টেম্বর স্টেডিয়াম এলাকায় তাকে তার এক ভাতিজা দেখেছিলেন। পরদিন ২৩শে সেপ্টেম্বর স্লুইস গেটের পাশে পানিতে ভাসতে থাকা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের স্ত্রী সবিতা রানী ধর বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে পিবিআই ছায়াতদন্ত শুরু করে।

পরে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তদন্তের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজীপুরের গাছা থানার বোর্ডবাজার এলাকা থেকে শামীমকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরে শামীমের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পাটার শিল ও বঁটি উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দ করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার আইনি প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান পিবিআই ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।